প্রতিনিধি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৮:১১:২১ প্রিন্ট সংস্করণ
গার্মেন্টস শিল্পে বিদেশি কর্মকর্তা ছাড়াও শতভাগ দেশি কর্মসংস্থান সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রায় অর্ধশতকের পুরোনো এই শিল্পে আজও অনেক কারখানায় বা বায়িং হাউজে ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশিদের এনে কাজ করাতে দেখা যায়। অথচ আমরা নিজেরাই যদি পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি, সেই মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা রয়েছে। তাহলে নিজেরাই পুরো শিল্প পরিচালনা করতে পারব। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মেধাবী ও দক্ষ পেশাজীবীদের একদিন অন্যান্য দেশ উচ্চ পদে নিয়োগ দিয়ে নিয়ে যাবে, এমন একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা ও কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
আজ রোববার বিকালে রাজধানীর বিজয় সরণিস্থ নভোথিয়েটারের একটি হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘ইনোভেশন ইন অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল: ড্রাইভিং কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, জনগণের বিপুল সমর্থনে দায়িত্ব পাওয়া একটি সরকারের জায়গা থেকে আমাদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, আমরা একদিকে যেমন টেকসই শিল্প প্রবৃদ্ধি দেখতে চাই, প্রচুর সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাই, তেমনি নিশ্চিত করতে চাই তরুণদের বিপুল কর্মসংস্থান। এমন এক কর্মসংস্থান, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে দেশের ভেতরে যেমন সম্মানজনক জীবিকা পাবে, তেমনি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও তাদের প্রবল চাহিদা তৈরি হবে। আর সেজন্যই আমরা কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। সরকার এমন শিক্ষাব্যবস্থা চায় যা শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করবে, তাদের পেশাগত দক্ষতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াবে। আমরা পাঠ্যক্রম এমনভাবে সংস্কার করছি যাতে শিল্প ও শিক্ষাঙ্গনের নিবিড় যোগাযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব বাস্তবিক রূপ পায়।
এর আগে শনিবার সকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিন দিনব্যাপী এ মেলার দ্বিতীয় দিনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে একটি গভীর আবেগ ও অনুভূতির জায়গা বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ এবং নগদ প্রণোদনার মতো যুগান্তকারী নীতি চালু হয়েছিল, যা আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে পোশাক খাতের ভূমিকা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী, আর এই খাতের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নারীরা আজ স্বাবলম্বী হচ্ছেন। গ্রামের একজন তরুণীর হাতে তৈরি পোশাক বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৌরবের সাথে প্রতিনিধিত্ব করছে। ফলে এই খাত কেবল অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, আবেগ এবং লাখো শ্রমিকের ত্যাগ ও শ্রমের প্রতীক।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গত সাত মাসে বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালু করা, উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে প্রণোদনা পৌঁছানো এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পটিকে আধুনিকায়নের জন্য কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে বিজিএমইএ ও বিটিএমএ-সহ সব অংশীজনের সাথে সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা সার্বক্ষণিক সংলাপ ও মতবিনিময় বজায় রাখছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে গবেষণা, উন্নয়ন এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতার দিক দিয়েও আরো উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। তাই শ্রমশক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নকশায় নতুনত্ব আনতে প্রতিটি কারখানায় গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাংলাদেশ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করবে, তবে তা হতে হবে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে। কোনো অবস্থাতেই প্রযুক্তির অজুহাতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কেড়ে নেওয়া সমীচীন নয়। মেহনতি মানবসম্পদের ত্যাগের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ আজকের বৈশ্বিক অবস্থানে পৌঁছেছে, তাই প্রযুক্তির ব্যবহারে মানবসম্পদ ও আধুনিকতার সঠিক সমন্বয় ঘটানোই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট সময়োপযোগী ও বিশেষায়িত কোর্স চালুর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং এক বছরের ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন, যাতে তরুণরা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই খাতে আরো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক শিক্ষার সাথে কারখানার বাস্তব কাজের সেতুবন্ধন তৈরি করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেছেন, এই লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের বাস্তব সুযোগ পায় এবং শিল্পখাতের সফল ব্যক্তিত্বরা ক্যাম্পাসে গিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া তরুণদের জন্য নিয়মিত ক্যারিয়ার মেলা ও দিকনির্দেশনামূলক কর্মসূচির ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
তরুণদের প্রতিভাবান উদ্ভাবকদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, তরুণদের নতুন স্টার্টআপ প্রকল্পে প্রাথমিক মূলধন ও তহবিল জোগান দেওয়ার বিষয়ে সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অভাবে অনেক কাজ থমকে ছিল, যা স্বল্প সময়ে পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তবে সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সরকারের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতায় কোনো ঘাটতি নেই বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইনোভেশন’ স্লোগানের লক্ষ্যেকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, বিপুল তরুণ শক্তি ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্পৃহা নিয়ে বাংলাদেশ অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে। সরকার যুগোপযোগী ও সহায়ক নীতি প্রণয়ন করবে এবং বেসরকারি খাত তা বাস্তবায়ন করবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারিত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একটি শিল্প এককভাবে কখনো সফল হতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, টেকসই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশব্যবস্থা বা ইকোসিস্টেম, যেখানে সকল অংশীজন একযোগে কাজ করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রাজ্ঞ প্যানেলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা মালিক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতি-নির্ধারকদের একত্রীকরণকে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘৩৬০ ডিগ্রি’ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তরুণদের ভূয়সী প্রশংসা করে মাহ্দী আমিন বলেন, এই তরুণ সমাজই কেবল তৈরি পোশাক খাত নয়, পুরো বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল কারিগর। শিল্পখাতের নীতি-নির্ধারক ও ভবিষ্যতের কর্ণধারদের এই যৌথ উপস্থিতিকে তিনি একটি পরিপূর্ণ এবং প্রশংসনীয় আয়োজন হিসেবে তুলে ধরেন।
এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস, এক্সপোর্ট বন্ড ও আইটি বিভাগের সদস্য ফারজানা আফরোজ, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) উপাচার্য ইঞ্জিনিয়ার ড. আইয়ুব নবী খান, এইচ অ্যান্ড এম’র রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান, এইচএসবিসি বাংলাদেশের কর্পোরেট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ব্যাংকিংয়ের কান্ট্রি হেড শাদাব হোসেন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের হেড অব গ্লোবাল অ্যাপারেল সাপ্লাই চেইন আশফাকুর রহমান।
আলোচনা শেষে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ এ অংশ নেওয়া স্টলগুলো পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। মেলায় সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, নতুন স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান (এসএমই) এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন। আয়োজনে প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের এক হাজারের বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন প্রদর্শিত হচ্ছে।















