প্রতিনিধি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৯:১৩:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ
গাজীপুর সদর উপজেলায় চুরির অপবাদ দিয়ে এক পোশাক শ্রমিক নারীকে মারধর ও আটকে রেখে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার দরগারচালা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে ভুক্তভোগী ওই নারী মামলা করলে গত শুক্রবার অভিযুক্তদের একজনকে গ্রেপ্তার করে আজ রোববার তাকে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে পরিবারের ওপর অভিমান করে গ্রামের বাড়ি থেকে গাজীপুরে আসেন ওই নারী। সেখানে চাকরির সুবাদে দরগারচালা এলাকার হজরত আলীর স্ত্রী জাহানারা বেগমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে জাহানারা তাকে ধর্মবোন হিসেবে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই সম্পর্কের সূত্রে চাকরি করে জমানো প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা জাহানারার কাছে জমা রাখেন তিনি। কিছুদিন আগে সেই টাকা ফেরত চাইলে জাহানারা টাকা দেওয়ার কথা বলে নিজের বাড়িতে ডেকে নেন। সেখানে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দেন জাহানারা। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে একটি ঘরে আটকে রেখে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরে তাকে আটকে রাখার বিষয়টি বুঝতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘জাহানারা আমাকে ধর্মের বোন বানিয়েছিলেন। তাকে বিশ্বাস করে আমার জমানো টাকা তার কাছে রেখেছিলাম। টাকা ফেরত চাইলে তিনি গত বৃহস্পতিবার আমাকে বাড়িতে ডেকে নেন। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চুরির অপবাদ দিয়ে ঘরে আটকে রেখে কয়েকজন যুবক আমাকে মারধর ও পালাক্রমে ধর্ষণ করে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, পুলিশ আসার আগে স্থানীয়রা ভুক্তভোগীর বক্তব্য ভিডিও করে রাখেন। পরে পুলিশ ওই নারীকে আলাদা করে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য চাপ দেয় এবং তার বক্তব্য ভিডিও করে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী। পরে অভিযুক্ত জাহানারা বেগমের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে ভুক্তভোগীকে দিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওই নারী মাটিতে বসে কান্নাকাটি করে উপস্থিত লোকজনের সামনে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করেন।
অপরদিকে ঘটনাটি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন দৈনিক সরেজমিন বার্তা পত্রিকার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মিলন শেখ।
তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে মনে হয়েছে। তাই আমি ভুক্তভোগীর বক্তব্য নিতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে বিষয়টি জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকরা (ওসি) আল মামুনকে জানাই। তিনি ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিমকে ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসতে বলেন। এরপর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করে।’
তবে ভুক্তভোগীকে ২ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করার অভিযোগ অস্বীকার করে জয়দেবপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রেজাউল করিম বলেন, ‘একজন আমাকে জানিয়েছিল ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা ও জামাকাপড় নেওয়া হয়েছে। আমি সেগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের বলেছিলাম। ধর্ষণের বিষয়ে ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রথমে ধর্ষণের কথা বলেননি। অভিযুক্তরা তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে বলে জানান তিনি।’
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন বলেন, একজন আমাকে জানিয়েছিল ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা ও জামাকাপড় নেওয়া হয়েছে। আমি সেগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য অভিযুক্তদের বলেছিলাম। ধর্ষণের বিষয়ে ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রথমে ধর্ষণের কথা বলেননি। অভিযুক্তরা তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে বলে জানান তিনি।
এসআই রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং ভুক্তভোগীকে টাকা দিয়ে বিদায় করার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় হজরত আলী, তার স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩২), তরিকুল ইসলামের ছেলে সাইদুর (২৮), আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সজিব (২৪), সফিকুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৭) ও আফাজ উদ্দিনের ছেলে নাঈম (২৭) জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তার স্ত্রী ফোন করে জানান, তার ধর্মবোন টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকেছেন। পরে তার স্ত্রী ওই বোনের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর শনিবার সকালে তিনি পুরো ঘটনা জানতে পারেন।
তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।





















