আন্তর্জাতিক

ব্রিকসের যত কথা

  প্রতিনিধি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৬:৫৮:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লেগেছে বদলের হাওয়া। পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার পাশাপাশি নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। সেই প্রচেষ্টার অন্যতম বড় মঞ্চ ব্রিকস। চারটি দেশ মিলে এর যাত্রা শুরু হলেও এখন এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে নিয়ে বড় এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে সংস্থাটি। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, গ্লোবাল সাউথের প্রভাব বাড়ানোসহ আরও অনেক লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

১. ব্রিকসের জন্ম

ব্রিকসের গল্প শুরু হয়েছিল কোনো রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়। শুরুতে এটি ছিল বিশ্বের কয়েকটি দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতিকে নিয়ে একটি ধারণা। ২০০১ সালে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল একটি গবেষণাপত্রে ‘BRIC’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন— এই চার উদীয়মান অর্থনীতির নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে তৈরি করেছিলেন ব্রিক শব্দটি। তখনও ব্রিক নামে কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠন ছিল না।

ধারণাটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একসঙ্গে বৈঠক করেন। এটিকেই ব্রিকের আনুষ্ঠানিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে ধরা হয়।

এরপর ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ব্রিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। চার দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উদীয়মান দেশগুলোর ভূমিকা ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে একসঙ্গে অবস্থান নিতে শুরু করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি সামনে আসে।

পরের বছর, ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবুর্গে বসে ব্রিকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। চার দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক ছিল সংগঠনটির জন্য বড় একটি মাইলফলক। সেখান থেকেই প্রতিবছর শীর্ষ সম্মেলনের ধারাবাহিকতা শুরু হয়।

তবে ‘ব্রিক’ নামটি বেশিদিন চার দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১০ সালের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জোটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১১ সালের এপ্রিলে চীনের সানিয়ায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবার পূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশ নেয়। এর সঙ্গে BRICS-এর শেষে যুক্ত হয় ‘ঝ’, যা দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজি নাম South Africa -এর প্রথম অক্ষর। ব্রিক (BRIC) হয়ে যায় ব্রিকস (BRICS)।

এভাবেই একটি বিনিয়োগ গবেষণাপত্রে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ধারণা ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মে। পরবর্তী সময়ে এর পরিধি আরও বাড়ে। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল চারটি দেশ যথা— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে।

২. ছোট জোট থেকে বড় শক্তি

২০০৯ সালে যখন ব্রিকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন বসে, তখন এর সদস্য ছিল মাত্র চারটি দেশ— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। দুই বছর পর জোটের প্রথম বড় সম্প্রসারণ ঘটে। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে নামের শেষে যুক্ত হয় ‘ঝ’। BRIC হয়ে যায় BRICS।

এরপর আসে আরও বড় পরিবর্তন। ২০২৩ সালের আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে নেতারা জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন। নতুন করে আমন্ত্রণ জানানো হয় সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া ও ইরানকে। এই সম্প্রসারণ কার্যকর হয় ২০২৪ সালে।

তবে সম্প্রসারণ সেখানেই থামেনি। ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়াকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বাগত জানায় ব্রাজিল। এর ফলে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১১-তে। বর্তমানে সদস্য দেশগুলো হলো— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসে এখন শুধু সদস্য নয়, অংশীদার দেশের ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৪ সালের কাজান সম্মেলনে এই নতুন শ্রেণি তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালে বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা ও উজবেকিস্তানকে অংশীদার দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়। তবে তারা পূর্ণ সদস্য নয়।

এভাবে ব্রিকসের পরিধি শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে এই জোট। ফলে এর ভৌগোলিক বিস্তারের পাশাপাশি বেড়েছে জনসংখ্যা, জ্বালানি সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশীদারত্ব।

ব্রিকসের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সম্প্রসারণের পর সদস্য দেশগুলো মিলে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনেও তাদের সম্মিলিত অংশ প্রায় ৩৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তাদের সম্মিলিত অবস্থান উল্লেখযোগ্য।

তবে সংখ্যার এই বিশালত্বই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় গল্প নয়। আসল প্রশ্ন হলো এত ভিন্ন অর্থনীতি, ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দেশগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করবে? কারণ সদস্য যত বেড়েছে, ব্রিকসের সম্ভাবনা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যের সম্ভাবনাও।

২০২৬ সালে সেই বিস্তৃত ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। নয়াদিল্লি এবারের সভাপতিত্বের জন্য স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি সাজিয়েছে। অর্থাৎ, চার দেশের অর্থনৈতিক ধারণা থেকে শুরু হওয়া ব্রিকস এখন ১১ সদস্যের একটি বড় বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম।

৩. আসলে কী চায় ব্রিকস?

ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো একেক দিক থেকে একেক রকম। কারও অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, কেউ জ্বালানিসম্পদে সমৃদ্ধ, কেউ আবার সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে বড় শক্তি। রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এক নয়। তবু তাদের একটি জায়গায় মিল আছে। আর তা হলো, বিশ্বের সিদ্ধান্তগ্রহণের কাঠামোয় উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর প্রভাব আরও বাড়ানো। এটাই ব্রিকসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

জোটটির সরকারি বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিকস অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়াতে চায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানোও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই ব্রিকসের এই অবস্থানের কারণ কিছুটা বোঝা যায়। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ব্রিকস এসব প্রতিষ্ঠানে আরও ন্যায্য ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা চায়।

তবে ব্রিকসের লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানো নয়। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে একে অন্যকে সহযোগিতা করাও এর বড় উদ্দেশ্য।

এই সহযোগিতার ক্ষেত্রও এখন অনেক বিস্তৃত। অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়েও ব্রিকসের বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৫ সালের সম্মেলনে জোটটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১২৬টি অঙ্গীকার গ্রহণ করে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নয়ন অর্থায়ন। ব্রিকসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়টিও ব্যাংকটির অন্যতম অগ্রাধিকার।

আর এখানেই ব্রিকসের একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। জোটটি মনে করে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো এমন হওয়া উচিত যেখানে শুধু পুরনো ও উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রভাব থাকবে না। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোরও সেখানে যথেষ্ট কণ্ঠ থাকবে।

তবে ব্রিকস নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে উপস্থাপন করে না। বরং এর ঘোষিত লক্ষ্য হলো বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ করা।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ ব্রিকসের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে রাশিয়া ও চীন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার কঠোর সমালোচক। আবার ভারত, ব্রাজিলসহ অন্য সদস্যরা একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ব্রিকসের সামনে বড় প্রশ্নটি হলো, বিভিন্ন স্বার্থের এতগুলো দেশ কি সত্যিই একটি অভিন্ন বৈশ্বিক এজেন্ডা তৈরি করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ব্রিকসকে আরেকটি শক্তিশালী বৈশ্বিক জোটের সঙ্গে তুলনা করতেই হয়। সেই জোট হলো জি৭।

৪. জি৭ বনাম ব্রিকস; কোথায় কে এগিয়ে?

বিশ্ব অর্থনীতির শক্তির হিসাব করতে গেলে এখন দুটি জোটের নাম বারবার সামনে আসে, যথা জি৭ এবং ব্রিকস। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানকে নিয়ে গঠিত জি৭। অন্যদিকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবকে ঘিরে বিস্তৃত ব্রিকস কাঠামো।

দুই জোটের চরিত্র অবশ্য এক নয়। জি৭ মূলত বিশ্বের কয়েকটি উন্নত ও শিল্পোন্নত অর্থনীতির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফোরাম। ব্রিকসের সদস্যদের বড় অংশ উদীয়মান অর্থনীতি এবং গ্লোবাল সাউথের দেশ। তাই শুধু মোট জিডিপি দিয়ে দুই জোটের শক্তি বিচার করলে পুরো ছবিটা পাওয়া যায় না।

জনসংখ্যার দিক থেকে ব্রিকস অনেক এগিয়ে। ১১ সদস্যের ব্রিকস বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২৫ সালের ব্রিকসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাদের সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে জি৭-এর সাত দেশ মিলে বিশ্বের জনসংখ্যার তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

অর্থনীতির হিসাবেও ব্রিকসের ওজন দ্রুত বেড়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। অর্থনীতির আকার মাপতে সাধারণত নমিনাল জিডিপি এবং ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি এই দুই ধরনের হিসাব ব্যবহার করা হয়।

নমিনাল জিডিপিতে একটি দেশের অর্থনীতির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের বিনিময় হারে হিসাব করা হয়। অন্যদিকে পিপিপি হিসাব করে একটি দেশের অভ্যন্তরে একই অর্থ দিয়ে কতটা পণ্য ও সেবা কেনা যায়। ফলে তুলনামূলক কম দামের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা হিসাবে অনেক বেশি বড় দেখাতে পারে।

এই পিপিপি হিসাবেই ব্রিকসের শক্তি সবচেয়ে স্পষ্ট। ব্রিকসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জোটটির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান ছিল। ২০২৫ সালে এই অংশ প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ পিপিপির হিসাবে ব্রিকস ইতোমধ্যেই জি৭-এর সমান বা তার চেয়ে বড় অর্থনৈতিক ওজন তৈরি করেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকসের অর্থনীতি জি৭-এর চেয়ে সব দিক থেকে শক্তিশালী।

কারণ মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জি সেভেনের এর সদস্য দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে। তাদের নাগরিকদের গড় আয়, জীবনযাত্রার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবা উৎপাদনের ক্ষমতা ব্রিকসের অধিকাংশ সদস্যের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে ব্রিকসের বিশাল অর্থনৈতিক ওজনের বড় অংশ এসেছে চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশ থেকে। আবার রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মতো দেশগুলোর রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ। ব্রাজিল কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে শক্তিশালী। ফলে ব্রিকসের শক্তি অনেকটাই তার আকার, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দ্রুত বাড়তে থাকা বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

জি সেভেনের শক্তি আবার অন্য জায়গায়। এই জোটের দেশগুলোর রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় বহুজাতিক কোম্পানি এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায়ও তাদের প্রভাব এখনও ব্যাপক।

তাই ব্রিকস বনাম জি সেভেনের লড়াইকে সরলভাবে ‘কে বেশি শক্তিশালী’, এই প্রশ্নে নামিয়ে আনা যাবে না। বরং বলা যায়, দুই জোট দুই ধরনের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে।

৫. ডলারের আধিপত্য ভাঙার চেষ্টা

ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হলেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে, এই জোট কি ডলারের বিকল্প তৈরি করতে চাইছে? প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা জটিল। কারণ ব্রিকসের সদস্যরা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বললেও এখন পর্যন্ত একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর কোনো প্রস্তাব নেই। ২০২৬ সালের দিল্লি সম্মেলনের আগেও ভারত স্পষ্ট করেছে, এমন কোনো অভিন্ন মুদ্রা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। বরং সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও লেনদেন বাড়ানোর দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। ফলে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশ ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে আরও বেশি বিকল্প তৈরি করতে আগ্রহী।

এই লক্ষ্যেই ব্রিকস বহু বছর ধরে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনা করছে। ২০২৪ সালের কাজান ঘোষণায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এবং তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় আর্থিক লেনদেন বাড়ানোর বিষয়টি স্বাগত জানানো হয়। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের দিল্লি সম্মেলনে বিষয়টি আরও বাস্তব রূপ পায়। সম্মেলনের ঘোষণায় সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের লেনদেন সহজ করার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য হলো আন্তঃসীমান্ত অর্থ পরিশোধকে আরও দ্রুত, সস্তা ও নিরাপদ করা। ব্রিকসের পেমেন্ট টাস্কফোর্স সদস্য দেশগুলোর বিভিন্ন পেমেন্ট ও বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও সহজে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।

এর অর্থ হলো, ব্রিকসের বর্তমান কৌশল অনেকটাই বাস্তবভিত্তিক। একটি নতুন মুদ্রা তৈরি করে রাতারাতি ডলারের জায়গা নেওয়ার চেষ্টা নয়। বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভারতীয় রুপি, চীনা ইউয়ান, রুশ রুবল বা অন্য সদস্য দেশের মুদ্রায় সরাসরি লেনদেন করা সহজ হবে।

এখানে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ডলারের আধিপত্য ভাঙার কোনো রাজনৈতিক অভিযানকে সামনে না এনে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং সহজ আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টের ওপর জোর দিচ্ছে। রাশিয়াও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বলেছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রাকে বাদ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে না এবং গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন অর্থ পরিশোধ পদ্ধতির জন্য উন্মুক্ত।

তবু পরিবর্তনের ইঙ্গিতটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস এখন এমন একটি আর্থিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ডলারই একমাত্র পথ না থাকে। স্থানীয় মুদ্রা, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট এবং সদস্য দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ, এই তিনটি ক্ষেত্রেই সেই বিকল্প তৈরির চেষ্টা চলছে।

অর্থাৎ ব্রিকসের লড়াই এখনই ডলারের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি যুদ্ধ নয়। বরং লক্ষ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ডলারের বিকল্প পথও কার্যকর থাকে।

৬. নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্রিকসের বাস্তব অর্জন

ব্রিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব উদ্যোগগুলোর একটি হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের ফোর্তালেজা সম্মেলনে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার চুক্তি সই হয়। ২০১৫ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য হলো ব্রিকস ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অবকাঠামো এবং টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা।

প্রথমে ব্যাংকটির সদস্য ছিল ব্রিকসের পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। পরে সদস্য পদ বাড়ে। বাংলাদেশ ২০২১ সালে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২১ সালে, মিসর ২০২৩ সালে এবং আলজেরিয়া ২০২৫ সালে NDB-এর সদস্য হয়।

NDB পরিবহন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশও এর অর্থায়নের আওতায় এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে NDB -এর প্রথম ঋণ অনুমোদিত হয়।

তবে NDB নিজেকে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখে না। বরং বিদ্যমান বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর কাজের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার কথা বলে।

এই ব্যাংকই দেখায়, ব্রিকস শুধু রাজনৈতিক আলোচনা নয়; নিজেদের উন্নয়ন অর্থায়নের প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে।

৭. একই ছাতার নিচে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরান

ব্রিকসের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। একই মঞ্চে আছে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরান, ব্রাজিলসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। কিন্তু এসব দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সবসময় এক নয়।

রাশিয়া ও চীন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে বেশি সোচ্চার। অন্যদিকে ভারত ব্রিকসকে কোনো পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখতে চায় না। দিল্লি একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।

ব্রিকসের ভেতরে ভারত-চীন সম্পর্কও একটি বড় বাস্তবতা। সীমান্ত বিরোধ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা থাকলেও দুই দেশ একই জোটে থেকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার জায়গাগুলো ধরে রেখেছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই ধরনের জটিলতা আছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক অবস্থান এক নয়। ২০২৬ সালের দিল্লি সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে এই পার্থক্য ব্রিকসের ঐকমত্য তৈরিকে কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সদস্যরা যৌথ ঘোষণায় একমত হয়।

অর্থাৎ ব্রিকসের শক্তি যেমন এর বৈচিত্র্যে, দুর্বলতাও সেখানে। এত ভিন্ন স্বার্থের দেশকে একই সিদ্ধান্তে আনা সহজ নয়। ভবিষ্যতে ব্রিকস কতটা কার্যকর শক্তি হয়ে উঠবে, তার বড় পরীক্ষা হবে এই অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলাতে পারা।

৮. পাকিস্তানকে কেন নেওয়া হচ্ছে না?

ব্রিকসের অংশীদার হওয়ার আগ্রহ দেখানো দেশগুলোর তালিকায় পাকিস্তানের নাম ছিল। তবে ২০২৪ সালে অংশীদার হওয়ার জন্য আমন্ত্রিত ১৪ দেশের চূড়ান্ত তালিকায় পাকিস্তান ছিল না। পরে যেসব দেশ অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে, সেখানেও পাকিস্তানের নাম নেই। ফলে পাকিস্তান এখনও BRICS-এর সদস্য বা অংশীদার কোনোটিই নয়।

ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিরোধ এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে। তবে শুধু ভারতের আপত্তির কারণেই পাকিস্তানকে নেওয়া হয়নি, এমন নিশ্চিত তথ্য নেই। BRICS -এর অংশীদার নির্বাচনে সদস্যদের সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক, ভৌগোলিক ভারসাম্য এবং ঐকমত্যের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়।

পুতিনের কটাক্ষ জি৭-কে

ব্রিকস সম্মেলনে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন জোট জি৭-কে কটাক্ষ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দিল্লিতে ব্রিকস বিজনেস ফোরাম-এ তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শক্তিগুলো দ্রুত উঠে আসছে। তার দাবি, গত পাঁচ বছরে ব্রিকস দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ৪০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে, যেখানে জি সেভেনের অবদান ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ।

পুতিনের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল— বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসছে। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেন।

আরও খবর

Sponsered content