প্রতিনিধি ২৪ আগস্ট ২০২৪ , ১১:২৩:৫৩ প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও স্বনির্ভরতার ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক, উন্নয়নের স্থপতি এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯৫২ সালে করাচি একাডেমি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে ডি. জে কলেজে ভর্তি হন। একই বছর পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুল-এ ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করে ১৯৫৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর নিবেদিতপ্রাণ দায়িত্বশীলতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি “বীরত্বসূচক পুরস্কার” লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে জিয়া মুক্তিকামী বাঙালিদের সঙ্গে যোগ দেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। জেড ফোর্সের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকার জন্য তাঁকে “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত করা হয়।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে ফিরে এসে তিনি ১৯৭৩ সালে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটে জাতি যখন চরম অস্থিরতায় নিমজ্জিত, তখন জিয়াউর রহমান দৃঢ় হাতে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরান।
তিনি সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল বিলুপ্ত করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটে ১৯ দফা কর্মসূচিতে, যার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন “গ্রাম হবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু”। তাই তিনি উলশী গ্রাম থেকে স্বনির্ভরতা আন্দোলনের সূচনা করেন। কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎ, বৃক্ষরোপণ, পরিবার পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা—সব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ উন্নয়নের কর্মসূচি চালু করেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য খাল খনন, বহু ফসল উৎপাদন ও পতিত জমি চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর আমলে প্রায় ৯০০ মাইল খাল খনন করা হয়।
তিনি গণস্বাক্ষরতা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান করেন এবং ১৯৮৫ সালের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৮০% উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে “এক ছেলে এক মেয়ে” নীতি চালু করেন এবং ৩৮ হাজার পরিবার পরিকল্পনা কর্মী নিয়োগ দেন।
১৯৮০ সালে “গ্রাম সরকার” আইন পাশ করে প্রশাসনকে তৃণমূল পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করেন।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে জাতীয় যুব সম্মেলনের মাধ্যমে যুবসমাজকে দেশ গঠনে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৮ সালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গঠন করে যুব সমাজের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) গঠন করে গ্রামীণ নিরাপত্তা জোরদার করেন।
নারীর ক্ষমতায়নে তিনি মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেন।
শিশুদের মানসিক বিকাশে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং টেলিভিশনে “নতুন কুঁড়ি” প্রতিযোগিতা চালু করেন।
গার্মেন্টস, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্প ও চামড়াজাত শিল্পের প্রসারে তাঁর উদ্যোগেই বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন দিগন্তে পৌঁছে যায়।
তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় ঘটান।
জিয়াউর রহমান স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মর্যাদায় উন্নীত করেন। ইন্দো-সোভিয়েত বলয়ের বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা, ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল সমর্থন, ওআইসি-কে কার্যকর সংগঠনে রূপ দিতে অবদান, এবং সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব তাঁকে একজন দূরদর্শী আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে পরিচিত করেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন এক অবিচল দেশপ্রেমিক, যিনি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বপ্নে সারাজীবন কাজ করেছেন। তাঁর কর্ম, আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও জনগণের অনুপ্রেরণার উৎস।














