আন্তর্জাতিক

জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি ইরানের, অর্থনৈতিক সংকটে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

  প্রতিনিধি ২৪ আগস্ট ২০২৬ , ১১:৫৮:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় ইরানে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, সমুদ্রবন্দর ঘিরে চাপ এবং চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বিপুল জ্বালানি ভর্তুকি সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা যায়।

তবে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অতীতে এ ধরনের পদক্ষেপ দেশটিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ২০১৯ সালে পেট্রোলের দাম বাড়ানোর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের কয়েক সপ্তাহ আগেও জ্বালানি মূল্যসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

এ কারণে এবারও সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সরকার। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

রোববার এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, জনগণের ওপর চাপ কমানোর জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে তার ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চালানোর হুমকি দেওয়ার পর গতকাল রোববার তেহরানের খোলা বাজারে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দর রেকর্ড নিম্নে নেমে যায়। এদিন এক ডলারের বিনিময়ে ২০ লাখ রিয়াল পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

ইরানে বর্তমানে পেট্রোলের বিভিন্ন মূল্যস্তর চালু রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, দেশের শোধনাগারগুলোতে এক লিটার পেট্রোল উৎপাদনে সরকারের খরচ প্রায় ১৩ লাখ রিয়াল। অথচ সবচেয়ে কম দামের স্তরে জনগণকে তা বিক্রি করা হয় মাত্র ১৫ হাজার রিয়ালে।

ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য আরও দুটি মূল্যস্তর রয়েছে- প্রতি লিটার ৩০ হাজার ও ৫০ হাজার রিয়াল। আমদানি করা, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল থেকে আসা বা নতুন নিবন্ধিত গাড়ির মালিকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মূল্যস্তর প্রযোজ্য।

তবে ভর্তুকি মূল্যের জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও মাসিক সীমা রয়েছে। সবচেয়ে কম দামের জ্বালানির জন্য প্রতি মাসে ৬০ লিটারের কোটা নির্ধারিত। চলতি ইরানি বছরের শুরুতে দ্বিতীয় স্তরের কোটা ১০০ লিটার থেকে কমিয়ে ৭০ লিটার করা হয়। জুলাইয়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর তা আরও কমিয়ে ৫০ লিটার করা হয়েছে।

বর্তমানে ইরানে প্রতিদিন প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে। বিপরীতে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ লিটার। ঘাটতি পূরণে সরকার শোধনাগারে উৎপাদন বাড়ানো, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ব্যবহার এবং জ্বালানির মান কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিও বন্ধ রয়েছে।

সরকারের জ্বালানি দক্ষতা বিভাগের প্রধান ইসমাইল সাগাব-এসফাহানি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রথম বিকল্পে দাম অপরিবর্তিত রাখা হবে। তবে কোনো পাম্পে বরাদ্দ করা জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিকল্পে গাড়ি না থাকা ব্যক্তিসহ সব ইরানিকে মাসে প্রায় ৩০ লিটার করে সর্বনিম্ন মূল্যের জ্বালানি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। যারা গাড়ি চালান না, তারা চাইলে নিজেদের কোটা বিক্রি করতে পারবেন।

তৃতীয় বিকল্প হলো সবার জন্য জ্বালানির দাম বাজারমুখী করা। এ ক্ষেত্রে প্রতি লিটারের দাম প্রায় ৮ লাখ ৭২ হাজার রিয়াল করার কথা বিবেচনা করছে সরকার। তবে এতে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবচেয়ে কম দামের ৬০ লিটারের কোটা আপাতত বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় স্তরের কোটা ধীরে ধীরে কমানো হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম স্বচ্ছভাবে উদারীকরণ করে অতিরিক্ত রাজস্ব দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ব্যয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এরই মধ্যে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় সামগ্রিক পণ্যের দাম ৮৮ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১২৮ শতাংশ।

তেহরানের এক পোশাককর্মী বলেন, সরকার প্রায়ই অন্য দেশগুলোর তুলনায় ইরানে জ্বালানির দাম কম থাকার কথা বলছে। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানিদের বেতন কতটা কম, সে বিষয়টি তারা উল্লেখ করছে না।

একজন গাড়িচালকও বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। তার ভাষায়, বর্তমান দামেই মানুষ চরম চাপে রয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content