জাতীয়

রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি: ভাষা আন্দোলনের মাস শুরু, শহিদদের আত্মত্যাগে প্রতিষ্ঠিত মাতৃভাষার মর্যাদা

  প্রতিনিধি ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ১২:৩৬:১১ প্রিন্ট সংস্করণ

মাতৃভাষার অপমান বাঙালি কখনো মেনে নেয়নি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উড়ে এসে কেউ ঘোষণা করবে—‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’—এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র-জনতা শুরু থেকেই সোচ্চার হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সাল থেকেই প্রতিবাদের বীজ বপন হয়, যা সংগঠিত গণআন্দোলনে রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অসংখ্য ভাষাশহিদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদা। সেই শহিদদের স্মৃতিতে রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি—ভাষা আন্দোলনের মাস—আজ থেকে শুরু হলো। বাঙালির কাছে এ মাস ভাষার মাস, আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করে। ভাষাশহিদদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করে, যাতে ভাষা আন্দোলনের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যায়।

ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ও মুসলিম লিগের সভাপতি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় ঘোষণা দেন—‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ একই বক্তব্য তিনি কার্জন হলেও পুনর্ব্যক্ত করেন। তখন উপস্থিত ছাত্ররা ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ জানালে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তার কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়। এখান থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথচলা আরও দৃঢ় হয়।

বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলাজুড়ে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকসহ অনেকে শহিদ হন।

তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাঙালি জাতি অর্জন করে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করতেই প্রতিবছর ফিরে আসে ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি—শ্রদ্ধা, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার অনন্য প্রতীক হয়ে।

আরও খবর

Sponsered content