প্রতিনিধি ১ নভেম্বর ২০২৬ , ১:১৭:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকি থেকে ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতির সুযোগে শনিবার ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে ফিরেছেন বহু বেসামরিক নাগরিক। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে এ ধরনের প্রথম মানবিক যুদ্ধবিরতিতে বড় পরিসরে বেসামরিক মানুষের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা ঘটল। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা এবং পোপের সম্পৃক্ততায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর স্থানীয় পর্যায়ে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ, ছয় দিনের যুদ্ধবিরতি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ওলেশকি থেকে ইউক্রেনের নাগরিকেরা চেরনিহিভ অঞ্চলে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। মধ্যস্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও মেলানিয়া ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
ফিরে আসা বাসিন্দাদের স্বাগত জানাতে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ‘আপনারা একা নন’ এবং ‘আমরা হৃদয় দিয়ে আপনাদের আলিঙ্গন করছি’ লেখা পোস্টার নিয়ে অপেক্ষা করেন। তাদের অনেকেই ছিলেন বয়স্ক, অসুস্থ ও শারীরিকভাবে দুর্বল। কারও হাঁটতে সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে, আবার কয়েকজনকে স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ারে করে বিমান থেকে নামানো হয়।
ফেরত আসা এক বৃদ্ধ রয়টার্সকে জানান, গত এক বছরে তার ওজন ২০ কেজি কমে গেছে। শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আরেক বাসিন্দা সভিতলানা ইয়ারমাকোভা বলেন, খাদ্যসংকটের কারণে তাদের ঘাস খেয়েও বেঁচে থাকতে হয়েছে। নিজের ও পোষা কুকুর ম্যানিলার খাবার জোগাড় করতে মাইন পাতা এলাকা পেরিয়ে সাইকেলে করে পাশের গ্রামে যাওয়ার ঝুঁকিও নিয়েছিলেন তিনি।
ওলেশকি থেকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পৌঁছাতে বাসিন্দাদের দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। প্রথমে বাসে করে ক্রিমিয়া হয়ে রাশিয়ার আনাপা শহরে যান তারা। সেখান থেকে বিমানে বেলারুশে পৌঁছে পরে ইউক্রেনে প্রবেশ করেন।
বেলারুশের একটি বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানো বাসিন্দাদের নামার ভিডিও প্রকাশ করেন ইউক্রেনের মানবাধিকার ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেৎস। তাদের সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু মালপত্র। কয়েকটি কুকুরকে খাঁচায় করে নামানো হয়। বেলারুশ থেকে বড় বাসে করে চেরনিহিভ অঞ্চলে পৌঁছালে স্বজনদের সঙ্গে তাদের আবেগঘন পুনর্মিলন ঘটে। এ সময় অনেককে কাঁদতে দেখা যায়।
ফেরত আসা মানুষদের সহায়তায় সেখানে অ্যাম্বুলেন্স, সামরিক তাঁবু ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা রাখা হয়। তাদের জন্য গরম খাবার, চা, পানি ও পোষা প্রাণীর খাবার সরবরাহ করা হয়।
লুবিনেৎস বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা থেকে শুরু করে ওলেশকিতে সরাসরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে আনা পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল জটিল।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার কর্মকর্তাদের দাবি, মঙ্গলবার থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং এ পর্যন্ত তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। এর ফলে শহরের সড়কগুলো থেকে মাইন অপসারণ এবং খাদ্য, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
যুদ্ধ ও ড্রোন হামলার কারণে ওলেশকির সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন ছিল। কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, মে মাসে শহরে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শত শত মানুষ অনাহারের মুখে পড়েন। রোববার এই যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা।
লুবিনেৎস জানান, ইউক্রেনে ফিরে আসা বাসিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির বয়স ৯৪ বছর এবং সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স এক বছরের কিছু বেশি। তবে কতজন ফিরেছেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি। কিছু বাসিন্দা রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও চলমান পানির সরবরাহ না থাকা সত্ত্বেও ওলেশকিতে থেকে গেছেন।
রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভা জানিয়েছেন, শহরটির জীবনযাত্রার পরিস্থিতি এখনো কঠিন। সেখানে থেকে যাওয়া মানুষদের সহায়তায় তিনি ইউক্রেনের মানবাধিকার ন্যায়পালের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন। টেলিগ্রামে তিনি বলেন, এই মিশন শেষ হলেও নিয়মিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
যুদ্ধের আগে ওলেশকির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। সরিয়ে নেওয়ার আগে সেখানে আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ মানুষ অবস্থান করছিলেন। রুশ বাহিনী আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিক থেকেই শহরটি দখলে রেখেছে। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংস এবং আশপাশের এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর শহরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে খেরসন অঞ্চলের দক্ষিণাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি চললেও যুদ্ধের অন্যান্য অঞ্চলে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে। জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্যাস অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি উৎপাদনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
রুশ সংবাদমাধ্যম ভেদোমস্তির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ওলেশকি যুদ্ধবিরতির সময় দুই দেশের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যৌথভাবে কাজ করতে গিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি হয়েছে। তবে ক্রেমলিন শুক্রবার জানিয়েছে, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা; বৃহত্তর শান্তিপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একে সাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখা কঠিন।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারিতে স্থগিত হয়ে যাওয়া আলোচনা আবার শুরু করতে নভেম্বরের শুরুতে আবুধাবিতে বৈঠকে বসার কথা ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের।





















