সারাদেশ

সাতক্ষীরায় লাইসেন্সবিহীন ভেজাল তেলের কারবার : সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিককে হুমকি

  সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:০০:২২ প্রিন্ট সংস্করণ

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামালনগর বাইপাস এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্সবিহীন ও ভেজাল ভোজ্য তেলের রমরমা কারবার চালিয়ে আসছে আরিফুল ইসলাম নামে এক যুবক—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই অনুমোদন কিংবা খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ তেল বাজারজাত করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, আরিফুল ইসলাম ডিসি অফিসের অনুমোদনের কথা দাবি করলেও বাস্তবে তার ব্যবসার সঙ্গে পৌরসভার বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর ফাইল কিংবা ভ্যাট নিবন্ধনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি বিশেষ মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভেজাল তেল বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম নিজেকে “লাইসেন্সের ঊর্ধ্বে” দাবি করে সাংবাদিকদের হুমকি দেন বলে অভিযোগ। সাপ্তাহিক বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার জন্য তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিক মাস্টার হাবিবকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি মাদকাসক্ত মেঝ ভাই সাইফুলকে মাস্তান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

পরবর্তীতে সাংবাদিক হাবিব মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে গেলে তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষ অভিযোগে বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত সাইফুল প্রকাশ্যে বলেন, “প্রশাসন দেখার সময় নেই, বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে মেরে ফেলব।”

এ ঘটনায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সাপ্তাহিক বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার সম্পাদক রাজীব হাসানকে ফোন করে সাইফুল সরাসরি জীবননাশের হুমকি দেন। ফোনালাপে তারা স্বীকারোক্তির সুরে বলেন, তাদের ব্যবসা লাইসেন্সবিহীন, ভেজাল তেলের এবং রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, কোনো সরকারি নথি নেই—এই তথ্য শুধু আপনার কাছে আছে কারণ আপনি পত্রিকার সম্পাদক এবং সাংবাদিক হাবিব আপনার লোক।

এই প্রেক্ষাপটে সম্পাদক রাজীব হাসান বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেছেন।

এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই আরিফুল ইসলামের অস্বাভাবিক সম্পদের উত্থান কীভাবে সম্ভব হলো। তার পারিবারিক পটভূমি অনুযায়ী, পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দিনমজুর ও স্বল্পশিক্ষিত ছিলেন। তার পিতা একজন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ছিলেন এবং সামান্য সময়ের জন্য জনপ্রতিনিধি হলেও উল্লেখযোগ্য জমিজমা বা সম্পদের তথ্য নেই। তাহলে সদ্য পড়াশোনা শেষ করা একজন যুবক কীভাবে এত বিপুল অর্থের মালিক হলো—এই প্রশ্নের উত্তর চাইছে সাধারণ মানুষ।

এ বিষয়ে সাপ্তাহিক বর্তমান সাতক্ষীরা পত্রিকার সম্পাদক রাজীব হাসান বলেন, ভেজাল তেল সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি আইনগত সুরক্ষার জন্য থানায় জিডি করেছেন।

নাগরিক নেতা আক্কাস আলী বলেন, “ভোজ্য তেল ভেজাল জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গণমাধ্যমকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা ও হুমকি দেওয়া মানে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া। প্রশাসনকে দ্রুত এই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।”

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, বিষয়টি তারা অবগত আছেন। জিডি গ্রহণ করা হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন প্রশ্ন একটাই—ভেজাল তেল, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা, রাজস্ব ফাঁকি ও সাংবাদিক হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগের পর প্রশাসনের ভূমিকা কী হবে? নাকি জনস্বাস্থ্য ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা আবারও উপেক্ষিত থাকবে—এই প্রশ্নই ঘুরছে সচেতন মহলে।

আরও খবর

Sponsered content