স্বাস্থ্য

হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু, টিকা পাবে ৩৪ লাখ শিশু

  প্রতিনিধি ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২:১৯:১১ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এবারের ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া ২৪ লাখসহ মোট ৩৪ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের কেন্দ্র করে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ কর্মসূচি।

শনিবার রাজধানীর কড়াইলের টিএনটি খেলার মাঠে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, নির্ধারিত ৩৪ লাখ শিশুর মধ্যে ১০ লাখ সম্প্রতি ছয় মাস বয়সে পৌঁছেছে। অন্য ২৪ লাখ শিশু আগের বিভিন্ন টিকাদান কার্যক্রমে বাদ পড়েছিল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০১ জন। একই সময়ে হাম নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ২৪৮ জনে।

সরকার এর আগে একাধিক দফায় হাম-রুবেলার টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নতুন করে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল থেকে তিন ধাপে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে আরও জোরদার করা হয়। ওই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। পরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়।

দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর ব্যবধান থাকায় বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করতে ‘মপ-আপ’ কার্যক্রম শুরু করা হয়। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহার পর আরও ১৪ লাখ শিশুকে খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় এবার ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ কর্মসূচির জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় ৪০ লাখ ডোজ হাম-রুবেলা টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রয়োজনীয় টিকা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জরুরি ব্যবহারের জন্য ১০ লাখ ডোজ সংরক্ষণ করা হবে এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতেও এসব টিকা ব্যবহার করা হবে।

কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ছুটির দিন এবং সন্ধ্যার পরও বিভিন্ন কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি কাছের টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের সচেতন করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান তিনি।

অনুষ্ঠানে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি গিলিয়ান মেলসপ বলেন, হামের কারণে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু টিকাদানের গুরুত্বের একটি গুরুতর স্মারক। তিনি জানান, বিশেষ ক্যাম্পেইনের জন্য ইউনিসেফের অগ্রিম তহবিলের মাধ্যমে গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশে ৪৩ লাখ ডোজ হাম-রুবেলার টিকা পৌঁছেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নরওয়াল বলেন, বাংলাদেশে হাম-রুবেলার সংক্রমণ এখনও চলছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং টিকা না নেওয়া শিশুরা এ সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় টিকাদানের কভারেজে অসমতা থাকায় বাদ পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে নতুন ক্যাচ-আপ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অপতথ্য মোকাবিলায় গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান ডব্লিউএইচওর এই প্রতিনিধি।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আ ন ম বজলুর রশিদ বলেন, আগের দুই দফা হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে টিকা নেওয়ার পর শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এ কারণে তৃতীয় পর্যায়ে বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার নির্ধারিত ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হলে দেশে হাম ও রুবেলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও অগ্রগতি হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, এরই মধ্যে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। কোনো শিশুকে বাদ না দিতে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়েও শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। নতুন ধাপেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘ইনটেনসিফাইড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। কর্মসূচিটি চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচালিত দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের ১০৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও হামের সংক্রমণ কমেনি। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবিহীন শিশু।

এদিকে হামের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে দেশের ইপিআই ও প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো। আগামী ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর দেশের আট বিভাগের নির্বাচিত জেলা, উপজেলা ও টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শন করবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত দল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই পর্যালোচনায় মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম, রোগ নজরদারি ও প্রতিরোধব্যবস্থার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হবে।

আরও খবর

Sponsered content