স্টাফ রিপোর্টার ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১১:৩৬:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, সংযুক্ত কলেজসমূহ এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে প্রাক্তন কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদকে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, ২০০৮ সালে অর্থ তসরুপ ও দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি হারানোর পরও তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কলেজ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, অর্থ তসরুপের দায়ে ২০০৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউডি (UD) পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন মামুনুর রশিদ। চাকরি হারানোর পর তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা শুরু করেন। ওই ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সময় তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা (নং: ২৯(৭)১৯) দায়ের হয়। তবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার অভিযোগে তিনি এখনো গ্রেপ্তার হননি।
২০১২ সালে তিনি যৌথ মালিকানায় “ক্রাউন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি” প্রতিষ্ঠা করেন। অভিযোগ আছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি মহাখালী থেকে খিলক্ষেতে সহজে স্থানান্তরিত হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ অধ্যক্ষ বলেন, “ভিসির প্রভাব দেখিয়ে মামুনুর রশিদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে স্বেচ্ছাচারী প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানটি পর্যাপ্ত শিক্ষক বা অবকাঠামো ছাড়াই এলএলবি ও বিএড কোর্সের অধিভুক্তি পেয়েছে—যা নিয়মবহির্ভূত।”
মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে Professional Institute Association of National University (PIANU)-এর সভাপতির মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বলা হয়, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরকে নিয়ে অনুষ্ঠানের নামে বিভিন্ন কলেজ ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা দাবি করেছিলেন তিনি। অভিযোগের পর সংগঠনটি অনুষ্ঠান বাতিল করে এবং তাঁকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে।
PIANU-এর বর্তমান নেতারা গণমাধ্যমকে জানান, “মামুনুর রশিদ এখনও নিজেকে আমাদের সংগঠনের সভাপতি পরিচয় দেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি কলেজ অনুমোদন, নতুন বিষয় খোলা এবং কোর্স অনুমোদনের নামে অর্থ দাবি করছেন।”
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই আন্দোলনের পর মামুনুর রশিদ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে বিএনপি ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. আমানুল্লাহর ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে তিনি তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবেও বিভিন্ন কলেজ পরিদর্শনে গেছেন। পরিদর্শনের সময় ভিসির নাম ভাঙিয়ে অর্থ গ্রহণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারী কয়েকজন অধ্যক্ষ বলেন, “মামুনুর রশিদ নিজেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র’ দাবি করেন। তিনি বলেন—‘ভিসি এখন আমার পকেটে; কলেজ অনুমোদন থেকে শুরু করে পরিদর্শন—সব আমার মাধ্যমে হয়।’”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. আমানুল্লাহর সঙ্গে বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, অভিযোগ জানানো হলে মামুনুর রশিদ বলেন, “আমি নির্বাচিত PIANU সভাপতি। বর্তমান কোনো কমিটি নেই, তাই আমি দায়িত্ব পালন করছি। ২০০৮ সালে আমি নিজেই চাকরি ছেড়েছি—চাকরিচ্যুত হইনি। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
তিনি আরও বলেন, “ভিসি স্যার কখনো মাঝে মাঝে আমাকে কলেজ সফরে নিয়ে যান, কারণ প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠান বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা আছে।” রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিষয়ে তিনি জানান, মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক ও কলেজ প্রশাসনের প্রতিনিধিরা বলছেন, “যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় সুনামহানির কারণ হতে পারে। প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগবিরোধী প্রভাব, ভুয়া পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও রাজনৈতিক দাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার—এই পুরো ঘটনাটি এখন শিক্ষা অঙ্গনে আলোচিত একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।














