প্রতিনিধি ৯ জুলাই ২০২৬ , ২:৩৩:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার পর আবারও শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি হামলা। ফলে যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এরপর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সংঘাত কমানোর উদ্দেশ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি আর কার্যকর নেই। একই সঙ্গে তিনি ইরানে নতুন করে হামলার নির্দেশও দেন।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও দুই দেশ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই সমঝোতার আওতায় চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা আগের চেয়ে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে সামরিক চাপ বাড়ানো যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি পিছু হটাও সহজ নয়। বড় ধরনের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। আবার অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখালে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজের প্রভাব আরও বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
এই জলপথ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ চলাকালে ইরান দেখিয়েছে, প্রয়োজনে তারা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম। সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ট্রাম্পের ধারণা, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোই তার অন্যতম লক্ষ্য। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান বড় ধরনের কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থায় আছেন, যেখানে সামরিক কিংবা কূটনৈতিক কোনো পথেই সহজে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। এর রাজনৈতিক প্রভাবও রিপাবলিকানদের জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোস জরিপেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের অবস্থান ধরে রাখা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন আবারও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। তবু তেহরান আপাতত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, সাম্প্রতিক হামলাগুলো ভবিষ্যৎ আলোচনায় নিজেদের দরকষাকষির অবস্থান শক্ত করার কৌশলের অংশ হতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, পরিস্থিতি হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়াবে না। তবে স্থায়ী সমাধান ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলতে পারে।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ। ইরান মনে করে, এই নৌপথ পরিচালনায় তাদের আরও বড় ভূমিকা থাকা উচিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্ররা চায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পথটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকুক। এই বিরোধই দুই দেশের কৌশলগত দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জন অলটারম্যানের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে ট্রাম্প দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চান না। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোও দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে দেখতে চায়। তাই সামনের দিনগুলোতে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ দুই পথেই দরকষাকষি চলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সামনে এখন সহজ কোনো পথ খোলা নেই। যুদ্ধ চালিয়ে গেলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে, আবার দ্রুত পিছু হটলেও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। ফলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।





















