প্রচ্ছদ

“বিনা ভোটে ক্ষমতার ভাবনা: দেশ কি প্রস্তুত, ড. ইউনূস কতটা রাজি?”

  প্রতিনিধি ২৩ এপ্রিল ২০২৫ , ৭:৩২:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

রাস্তাঘাট বা মানচিত্র না দেখা গেলেও যেন দূর থেকে একটা তালগাছ চোখে পড়ে—তেমনি নির্বাচনের ইঙ্গিত চারদিকে পরিষ্কার। বোঝা যাচ্ছে, দেশ নির্বাচনমুখী হয়ে উঠেছে। সময় হলে ডিসেম্বর কিংবা জুনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের ট্রেন ছেড়ে দেবে। এমনকি সময়টা একটু এগিয়ে বা পিছিয়েও যেতে পারে।

এই যখন নির্বাচনী প্রস্তুতির হাওয়া, তখনই ড. ইউনূসকে আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় রাখার একটা জোর আলোচনা উঠে এসেছে। এটা কি তাঁকে সম্মান জানাতে, না কি অযথা বিতর্কে জড়িয়ে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে?

প্রথম যখন ড. ইউনূস নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বলেছিলেন, তখন ডিসেম্বরের কথাই বেশি উঠে আসে। সেনাপ্রধান বলেছিলেন, ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে, অর্থাৎ বড়জোর মার্চ। তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সেটি ধীরে ধীরে জুনের দিকে সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এমনকি তিনি নিজে বলেছিলেন, কম সংস্কার হলে ডিসেম্বর, বেশি হলে জুনে নির্বাচন। ফলে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে একটি সময়রেখা তৈরি হয়ে যায়।

যদিও জরুরি প্রয়োজনে এটি দু-এক মাস পিছোতে পারে, তবে কেউ তাতে প্রবল আপত্তি জানাবে না বলেই মনে হয়। কিন্তু একে পাশ কাটিয়ে পাঁচ বছরের জন্য ড. ইউনূস সরকারকে রেখে দেওয়ার যে আলোচনা উঠেছে, সেটি বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই ‘পাঁচ বছর’ ধারণার প্রচারক কারা? তাঁদের উদ্দেশ্য কী?

ড. ইউনূস এখনো নিজে থেকে কখনো বলেননি যে তিনি পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে চান। বরং আগেই তিনি বলেছেন, তাঁর আগের পেশায় ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাহলে এত কথা উঠছে কোথা থেকে? কিছু উপদেষ্টা ও ‘এনসিপি’ নামক একটি নতুন দলের কিছু নেতার কথায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এক উপদেষ্টা বলেছিলেন, জনগণ তাঁকে চাইছে। পরে আবার বলেন, এটা তাঁর নিজস্ব মত নয়—এটা রাস্তাঘাটে জনগণের বলা কথা।

এরপরেও আরেকজন উপদেষ্টা যখন বললেন, তাঁরাও নির্বাচিত—তখনই শুরু হলো বিতর্ক। কে, কবে তাঁদের নির্বাচিত করল? এমন প্রশ্ন উঠতেই থাকে। কথাগুলো শোনা যায় রাজনৈতিক কৌতুকের মতো।

ড. ইউনূসকে কেউ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় দেখতে চাইতেই পারে। কিন্তু তাঁকে ভোট ছাড়া ক্ষমতায় রাখার চিন্তা তাঁকে সম্মানিত না করে বরং বিতর্কিত করে তুলতে পারে। কেউ কেউ বলছে, শেখ হাসিনা ১৫-১৬ বছর ছিলেন, তাই ড. ইউনূসও থাকুন! কিন্তু দুই অবস্থার তুলনা কি যুক্তিযুক্ত?

বিশ্ব দরবারে ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল। তিনি শুধু বাংলাদেশের নন, সারা বিশ্বের একজন পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এমন একজন মানুষকে যদি কেউ বা তিনি নিজেই আজীবন ক্ষমতায় দেখতে চান, তবে তা জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কি উচিত?

সেই সুযোগ তো খোলা। চাইলে তিনি ও তাঁর সমর্থকেরা দল গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। জনগণ চাইলে বিপুল ভোটে তাঁরা জিতবেন, সম্মান পাবেন। কারো বলার কিছু থাকবে না। তাহলে কেন এই বিনা ভোটে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা?

‘মার্চ ফর ইউনূস’ জাতীয় কর্মসূচি কি তাঁকে সত্যি সম্মান দিচ্ছে, নাকি অপ্রয়োজনে বিতর্ক তৈরি করছে? এমন আয়োজন তাঁর অর্জনকে ছায়ায় ফেলতে পারে।

সরকার ও ড. ইউনূস উভয়ের এখন দায়িত্ব এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করা। এনসিপি জানিয়েছে, তারা এই আয়োজনের অংশ নয়। তাহলে কে বা কারা করছে?

এখন সময় দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা ডিসেম্বর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জুন হলেও হাতে সময় কম। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। আর নির্বাচনের প্রস্তুতিও সেভাবে এগিয়ে নিতে হবে—স্বচ্ছ ভোটার তালিকা, আসন পুনর্বিন্যাস, ভোটকেন্দ্র, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, নতুন দলের নিবন্ধন—সবকিছুই নির্বাচন পূর্ব প্রক্রিয়ার অংশ।

তবে ইসির একার পক্ষে পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। যে দেশ ১৭ বছর ভোট ছাড়া বা ভোটের নামে তামাশা করে এসেছে, তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছেন না। তাঁদের মূল চাহিদা—নির্বাচিত একটি স্থিতিশীল সরকার।

সেই সরকার গঠনের রূপরেখা তৈরির জন্য এখন সময়মতো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রয়োজন, অন্য কিছু নয়।

 

লিখেছেন:   এটিএম রাকিবুল বাসার ,

সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

আরও খবর

Sponsered content