প্রতিনিধি ১ আগস্ট ২০২৬ , ৬:১৮:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে ঢাকার মিরপুর-১০ গোলচত্বরে রাকিবুল হোসেন (২৯) গুলিতে হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ পিবিআই পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেছেন। যা আজ শনিবার জানা গেছে।
চার্জশিটে শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনকে অভিযুক্ত করার পাশাপাশি ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতি চেয়ে সুপারিশ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
চার্জশিটভুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ ও বিপ্লব কুমার, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, ইলিয়াস মোল্লা, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, এখলাস উদ্দিন মোল্লা, সাবেক কাউন্সিলর কাসেম মোল্লা।
অব্যাহতির আবেদন করা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক এমপি কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক এমপি গালিবুর রহমান শরিফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের এমডি মো. লোকমান হোসেন, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদার।
চার্জশিটে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১২ জুলাই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করার পর ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করে। যার ফলে কোটা পদ্ধতি নিয়ে পুনরায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্তে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে সূচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে আন্দোলন শুরু করে।
এই আন্দোলন রাজধানী ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যায়। এই কোটাবিরোধী আন্দোলনকে দমানোর জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীরা নিরস্ত্র, কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীদের ওপর দলবদ্ধভাবে তাদের ন্যায্য আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য বিভিন্ন অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি সরাসরি না মেনে নানান কৌশল অবলম্বন করেন এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে এই আন্দোলন বিপ্লবে রূপ নেয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আসামি শেখ হাসিনার সঙ্গে চার্জশিটভুক্ত অপর আসামিরা গোপন বৈঠক করে ছাত্র জনতার আন্দোলনকে দমন করার জন্য আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশনা প্রদান করেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতারা এবং পুলিশ অফিসাররা ছাত্র জনতার আন্দোলনকে দমন করার জন্য সারা বাংলাদেশ তথা মিরপুরের ছাত্র জনতাকে দমন করার জন্য উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। আসামিরা ষড়যন্ত্র করে সারা বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার যৌক্তিক আন্দোলনকে সহিংসভাবে থামানোর লক্ষ্যে সচেষ্ট ছিল। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন রাকিবুল। ওইদিন রাত ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিল মিরপুর-১০ এর গোলচত্বরে পৌঁছালে অজ্ঞাত আসামির ছোড়া বুলেটে রাকিবুল হোসেন (২৯) এর গলার বাম পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হন। সেখানে উপস্থিত লোকজন তাকে নিকটস্থ ড. আজমল হসপিটালে নিলে চিকিৎসক রাত ৯টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, তদন্তকালে ভিকটিমের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। আদালতের আদেশে হরিনাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিয়মমাফিক লাশ উত্তোলনের জন্য ভিকটিমের কবরস্থানে যান। পরিবারের সদস্যসহ এলাকার লোকজনের আপত্তির কারণে কবর থেকে ভিকটিমের লাশ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মামলার বাদী নিহতের পিতা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক্ক ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসেন এবং রাত ১টার সময় মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন ও ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে ভিকটিমের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরদিন ২০ জুলাই ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু থানার বাসুদেবপুর পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করেন।
এ ঘটনায় ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন আবু বক্কর। নিহত বাদীর দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছিলেন। তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত এমআইএসটি ইউনিভার্সিটি থেকে ২০২১ সালে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাকানিকালে গ্রাজুয়েশন শেষ করে সুপার জুটমিলের বনানী হেড অফিসে সহকারি ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করছিলেন।





















