প্রচ্ছদ

সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

  প্রতিনিধি ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ , ১২:০৭:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ভূমিকা কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের বিকাশ, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি বৃদ্ধিতে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর শাসনামল (১৯৭৫–১৯৮১) ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়—যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার বিকাশে তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী ও সংস্কৃতিবান রাষ্ট্রনায়ক। বই পড়া, সংগীত শ্রবণ, ক্রীড়া ও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল গভীর। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মার প্রতিফলন, যার মধ্য দিয়েই জাতির চেতনা, মনন ও ঐতিহ্য বিকশিত হয়।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক চেতনা

জিয়া ছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। তাঁর প্রবর্তিত এই দর্শনের মূলভিত্তি ছিল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সব নাগরিকের ঐক্য ও সংহতি। ১৯৮১ সালের ৮ জুলাই দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” শীর্ষক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন—

“আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, উদ্দীপনা, আন্তরিকভাবে ধারক ও বাহক আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি।”

তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। স্বাধীনতার যুদ্ধ এই সংস্কৃতিকে দিয়েছে দুর্বার শক্তি, যা আমাদের জাতিসত্তাকে করেছে অম্লান ও চিরজাগরিত।

রাজনৈতিক দর্শনে সংস্কৃতির স্থান

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার সময় ঘোষণাপত্রের ২৮ নম্বর ধারায় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ক্রীড়ার বিকাশকে দলীয় অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঘোষণায় বলা হয়—

“জাতির স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীল প্রতিভার সুষ্ঠু সার্বিক বিকাশের উদ্দেশ্যে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ক্রীড়ার সংগঠিত ও বিস্তৃততর উন্নয়নের প্রচেষ্টা নেওয়া হবে।”

এ ঘোষণার ভিত্তিতে দেশে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া কেন্দ্র স্থাপন, জননির্ভর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

সংস্কৃতির পরিকাঠামো গড়ে তোলা

বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশে ১৯৭৮ সালে শহীদ জিয়া প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)—যা মূলত তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেম ও সংস্কৃতিচর্চা জাগ্রত করতে ভূমিকা রাখে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে তিনি ১৯৭৮ সালে “দি বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স” জারি করেন, যা আজও বাংলা একাডেমির সাংগঠনিক কাঠামোর মূল ভিত্তি।

শিশুদের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল বিকাশে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, যার বার্ষিক জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আজও অব্যাহত। ১৯৭৯ সালে ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠা করেন শিশুপার্ক, এবং টেলিভিশনে চালু করেন জনপ্রিয় শিশু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান “নতুন কুঁড়ি”—যেখান থেকে অসংখ্য সাংস্কৃতিক প্রতিভা উঠে এসেছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও গণমাধ্যম উন্নয়ন

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণে তিনি গড়ে তোলেন রাঙামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এবং নেত্রকোনার বিরিশিরিতে উপজাতীয় কালচারাল অ্যাকাডেমি—যা পরবর্তীতে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট” নামে পরিচিত হয়।

চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে তিনি উদ্যোগ নেন ঢাকার অদূরে চলচ্চিত্র নগরী, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার। তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করেন এবং উন্নতমানের চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দেন।

গণমাধ্যম বিকাশে প্রতিষ্ঠা করেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)। শিক্ষাসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চালু করেন একুশে পদকস্বাধীনতা পদক। তাঁর আমলেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে চালু হয় রঙিন সম্প্রচার ব্যবস্থা, যা দেশের বিনোদন মাধ্যমকে নতুন যুগে প্রবেশ করায়।

সংস্কৃতি: জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক

জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন—সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া একটি জাতি তার আত্মপরিচয় হারায়। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় নীতিতে সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দেন। সাহিত্য, সঙ্গীত, ক্রীড়া, শিশু-কিশোর বিনোদন, চলচ্চিত্র, নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতি—সবখানেই তাঁর হাতের স্পর্শ ছিল সৃজন ও সংরক্ষণের প্রতীক।

আরও খবর

Sponsered content