জাতীয়

সরকারের ক্ষমতার মূল উৎস দেশের জনগণ: মাহ্দী আমিন

  প্রতিনিধি ২৪ জুলাই ২০২৬ , ৮:২৪:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের ক্ষমতার মূল উৎস দেশের জনগণ বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।

ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকসের (দায়রা) আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মাহ্‌দী আমিন বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। বিগত ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সংঘটিত রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নৃশংসতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বিএনপি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা ভুয়া মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বিএনপি। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এর একটি বড় কারণ হলো বিএনপি সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল।’

বিগত ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরে তিনিন বলেন, কেবল একটি দলই নয়, বরং গণতন্ত্রকামী প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল। ক্ষমতার আকার বা শক্তি যা-ই হোক না কেন, গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলা সব অংশীদারই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

গুমের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র বলেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকা ব্যক্তিরাও গুমের শিকার হয়েছিলেন। আল্লাহর রহমতে গুমের শিকার কিছু ভুক্তভোগী ফিরে আসতে পেরেছেন, কিন্তু অনেকের সেই ভাগ্য হয়নি। অনেকেই আর কখনোই ফিরে আসেননি।

মাহ্দী আমিন বলেন, হাজার হাজার মানুষের বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। ৭০০-এর বেশি মানুষ গুম হওয়ার পর এখনও ফিরে আসেননি। যে শিশুদের বাবা কিংবা যে স্ত্রীদের স্বামী আর ফেরেননি, তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতির বেদনা নতুন সরকার অনুধাবন করে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বজন হারানোর এই ব্যথা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন‌ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও এর একজন ভুক্তভোগী। তার বাবা যখন দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখন দেশের জন্যই প্রাণ হারিয়েছেন। তার মা মারা গেছেন, কারণ তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় জেলে রাখা হয়েছিল। এবং তার ভাইও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশের জন্য প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বেদনার সাথে প্রধানমন্ত্রী আত্মিকভাবে যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে এমন অবস্থায় ছিলেন যে তাকে কথা পর্যন্ত বলতে দেওয়া হয়নি। আদালত ও আইন ব্যবহার করে তার বাক্‌স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি কেবল শারীরিক নির্যাতনের শিকারই হননি, দীর্ঘদিন দেশে ফিরতে পারেননি, তার বাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তার স্ত্রী চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তার চাকরি বাতিল করা হয়েছিল। সুতরাং, এটি এমন একটি পরিবার যা একদম ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।’

মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে গুমের শিকার হয়েছিলেন।‌ মন্ত্রীসভার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ প্রতিটি নেতাকর্মী একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। অনেকের নামে শত শত ভুয়া মামলা দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, অতীতে একজন নারী ভোটার কেবল বিএনপিকে ভোট দেওয়ার অপরাধে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল। এগুলোই ইতিহাস। তৃণমূল থেকে শুরু করে সকল গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা চরম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র আরও বলেন, ‘বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা এমন একটি সরকার পেয়েছি, যার ক্ষমতার মূল উৎস দেশের সাধারণ জনগণ। এটি বিগত দেড় দশকের শাসন ব্যবস্থার চেয়ে একটি বিশাল পরিবর্তন। অতীতে ক্ষমতার উৎস জনগণ ছিল না, বরং ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশ পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন। যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা, অথচ সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছিল স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এবং জনগণকে দমন করতে।’

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার একটি ‘রিসেট বোতাম’ চেপে সম্পূর্ণ পরিষ্কার এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানান মাহ্‌দী আমিন। তিনি বলেন, ‘জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বাক্‌স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। এসব সংস্কার কেবল মুখের কথা নয়, বরং সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কাজের মধ্য দিয়েই তা বাস্তবায়িত হয়েছে।’

মাহ্দী আমিন বলেন, ‘অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের জানামতে গত পাঁচ মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা গুমের একটি ঘটনাও ঘটেনি। আমরা এই ইতিবাচক ঐতিহ্যটিই ধরে রাখতে ও সামনে এগিয়ে নিতে চাই।’

রাজনীতিতে প্রতিশোধের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ন্যায্য বিচারের এক নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বর্তমান সরকার বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘একদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীদারদের ভিন্ন ভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গির সহাবস্থান নিশ্চিত করা হবে, অন্যদিকে বিগত শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল অপরাধী ও হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট— কোনো অপরাধী যেন পার না পায়, আবার একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ মানুষ যেন একটি গণতান্ত্রিক দেশে মুক্ত মানুষ হিসেবে বাঁচার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না হয়।’

বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর থেকে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে পুনর্মিলন ও সমঝোতার যে পথ তৈরি হয়েছে, তাকেই বর্তমান সরকার তার মূল নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘গত চব্বিশের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশ সরকারবিহীন থাকা অবস্থায় বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বে সব গণতন্ত্রকামী দল রাজপথে থেকে শান্তি ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করেছিল।’

মাহ্দী আমিন জানান, ‘সামনের দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং বাক্‌স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে আমাদের উন্নয়ন এজেন্ডার অংশ হিসেবে লক্ষ্য হলো নারী ও যুবসমাজকে ক্ষমতায়িত করা এবং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যা কেবল গুটি কয়েকের জন্য নয় বরং সকলের জন্য প্রযোজ্য হবে।’

বর্তমান সরকার তার ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রথম পাঁচ মাসের সফলতা পুরো মেয়াদেও বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা। তিনি জানান, প্রশাসনিক গতি আনতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ করছে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজগুলো সময়মতো শেষ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র বলেন, ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, একতাবদ্ধ সমাজ গঠন এবং সর্বমতের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই আমাদের মূল অঙ্গীকার। আমরা প্রমাণ করেছি, জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং সরকারের পেছনে জনগণের সমর্থন থাকে, তবে তা অর্জন করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, প্রথম পাঁচ মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা যা করেছি, তা পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদেও বজায় রাখতে পারব।’

মাহ্দী আমিন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এত সংখ্যক মানুষ শহীদ, এত রক্তপাত, এত নৃশংসতা এবং দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের ত্যাগ, সংগ্রামের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় পেরিয়ে আজকের এই গণতান্ত্রিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের গণরায়ে নির্বাচিত এই সত্যিকারের সরকারের আমলেই প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উপযুক্ত সময়। এখনই সময় প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার, একসাথে এই দেশকে গড়ে তোলার।’

প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি সরকার প্রকৃতপক্ষে ‘জনগণের, জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা’—যা আমরা কথায় বা বক্তৃতায় সবসময় বলে থাকি। প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় নেতৃত্বে আমরা সেই স্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হব।’

আরও খবর

Sponsered content