প্রচ্ছদ

সারিয়াকান্দিতে অবাধে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

  মোঃ রাশেদ মিয়া, বগুড়া ।। দৈনিক মতপ্রকাশ ৫ মার্চ ২০২৫ , ৭:০৭:২৪ প্রিন্ট সংস্করণ

যমুনা ও বাঙালি নদী বিধৌত বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা। যমুনা ও বাঙালি উভয় নদীতেই অবৈধভাবে চলছে বালু উত্তোলন। উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে বালু উত্তোলন সহ দুর্গম চরের ফসলি জমি কেটেও চলছে বাণিজ্য। কাজলার জামথল ঘাট সংলগ্ন এলাকায় ৫ টি স্কেবেটর বসিয়ে শতাধিক অনুমোদনবিহীন ড্রাম ট্রাক ও মাহিদ্রা ট্রাক্টর দিয়ে চর থেকে মাটিকাটা হচ্ছে, পাশাপাশি বোরিং করেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়াও কামালপুর ইউনিয়নের রৌহাদহ পয়েন্টের ৫০ লাখ সিএফটি বালু বিক্রির পর সেখানে আবারও বাল্কহেড দিয়ে চর কেটে বালু উত্তোলন চলছে। একইসাথে হাটশেরপুর ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনে যমুনা নদী থেকে মাহিন্দ্রা ট্রাক্টর দিয়ে কাটা হচ্ছে বালু। সবগুলো পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাদের ছত্রছায়ায় যোগ দিয়েছেন কিছু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দও। নষ্ট হচ্ছে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দ্রুতই সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।
উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের জামথল বা মাদারগঞ্জ ঘাটে নামলেই চোখে পরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দৃশ্য। বালু উত্তোলনের স্থান থেকে ৫০ মিটার এলাকার মধ্যেই চলছে ৫৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী সংরক্ষণের কাজ। গত কয়েকমাস ধরেই কাজলা ইউনিয়নের বেড়াপাঁচবাড়িয়া চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। চরের সমতল ভূমি কাটতে ব্যবহৃত হচ্ছে ৬ টি স্কেবটর। যার ফলে এ চরে সৃষ্টি হয়েছে বেশ বড়বড় নতুন ক্যানেল। বালুগুলো শতাধিক অনুমোদন বিহীন ড্রাম ট্রাক এবং কৃষি কাজে ব্যবহৃত মাহিন্দ্রা ট্রাক্টর দিয়ে পরিবহনের মাধ্যমে জামালপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে এ উপজেলার জনবহুল মাদারগঞ্জ নৌ ঘাট থেকে মাদারগঞ্জ শহরগামী সড়কটি দিয়ে যানবাহন বা পথচারী চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পরেছে। এদিকে চরের ২ ফসলি জমি থেকে জোরপূর্বক বালু উত্তোলনের ফলে জমির মালিকেরা ফসলের অভাবে তাদের পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এখানে বেশ কয়েকটি বোরিং মেশিন বসিয়ে মাটির গভীর থেকে বালু উত্তোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি রাশেদ মিয়া, কাজলা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বেলাল এবং মাদারগঞ্জ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান সাকু সহ বেশকিছু অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সবাই অস্বীকার করেছেন। হাফিজুর রহমান সাকু বলেন, আমার বাড়ী তো জামালপুর, আমি কিভাবে সারিয়াকান্দি গিয়ে বালু তুলব? ওখানে ওখানকার স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত।
উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের রৌহাদহ পয়েন্টেও অবৈধভাবে বালু কেটে স্তুপ করা হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরেই। এখানে বেশ কয়েকটি বাল্কহেড দিয়ে বালু পরিবহন করে নিয়ে আসা হচ্ছে। বালুগুলো যমুনা নদীর চন্দনবাইশা মৌজা থেকে গভীর খননযন্ত্র বসিয়ে কাটা হচ্ছে। গত কয়েকমাস আগে একই পদ্ধতিতে ৪০ লাখ সিএফটি বালু উত্তোলন করার পর গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে ১০ জন বালুদস্যুকে আটক করা হয়। পরের দিন ২৪ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে প্রত্যেককপ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে তাদের ছেড়ে দেন। সেখানে উত্তোলিত বালু গুলো মৌখিকভাবে জব্দ করেন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু তার কয়েকদিন পরেই অবৈধভাবে উত্তোলিত বালুগুলো বিক্রি করেন স্থানীয় বিএনপির নেতৃত্বে থাকা কতিপয় অসাধু নেতা। এর কয়েকদিন পরেই একই ঘটনায় স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান উল আলমকে মারপিট করা হয়। পরে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেন। আবারও কামালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ সভাপতি হিটলু এবং স্থানীয় বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাদের নেতৃত্বে একই পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু কেটে স্তুপ করা হচ্ছে এবং কিছু বালু ড্রাম ট্রাক দিয়ে বিক্রিও করা হচ্ছে। তবে হিটলু বলেন, আমি কখনোই বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নই, আমার কোনও বালুর পয়েন্ট নাই। ওখানে সাবেক চেয়ারম্যান দুলালের নেতৃত্বে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অপরদিকে, উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের নিজ বলাইল বাজারের পূর্ব পাশে যমুনা নদীর চর কেটে ১০-১২ টি মাহিন্দ্রা ট্রাক্টর দিয়ে গভীর রাত থেকে শুরু করে সকাল ৮ টা পর্যন্ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এখানে বালু উত্তোলনে স্থানীয় বিএনপি নেতা বাবুল সহ বেশকিছু নেতারা যুক্ত থাকলেও এই পয়েন্টে এখনো বালু উত্তোলনের নেতৃত্বে আছে হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল ওয়াকি শিলু।
উপজেলার বাঙালি নদীর বিভিন্ন এলাকায় বালু খনন যন্ত্র (ড্রেজার মেশিন) বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বালুগুলো দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন পুকুর এবং জলাশয়গুলো ভরাট করা হচ্ছে। বাঙালি নদীতে আওয়ামী সরকারের সময়ে যারা বালু উত্তোলন করতেন, এখনও তারাই এখানে বালু উত্তোলন করছেন।
এ গ্রামের কৃষক রেজা, সাত্তার, ভিক্ষু জানান, আমাদের প্রায় ২৫ বিঘা জমির মাটি স্কেবেটর বসিয়ে জোরপূর্বক কেটে নিয়ে গেছে প্রভাবশালী নেতারা। জমিতে এখন ১৫ ফিট ক্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে। জমিগুলোতে বছরে ২ টি করে ফসল পাওয়া যেত। এখন আমরা কি খেয়ে বাঁচব। তাছাড়া বালু পরিবহনের ফলে জামথল গ্রামের রাস্তা দিয়ে চলাচল একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পরেছে। এভাবে বালু তোলায় আমাদের গ্রামকে রক্ষার জন্য নদী সংরক্ষণ কাজটিও হুমকির সন্মুখীন হচ্ছে। গত সরকারগুলোর সময় তো এরকমের পরিবেশ কখনো সৃষ্টি হয়নি।
চন্দনবাইশা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি চাঁন মিয়া বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই রৌহাদহ পয়েন্টে চন্দনবাইশা মৌজা থেকে বালু কেটে স্তুপ করা হচ্ছে। আমি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার রহমান।

আরও খবর

Sponsered content