প্রতিনিধি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৯:২৬:১৪ প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের উত্তরপাড়ার মো. বাবুল শেখ (৫৬)। বাবা প্রয়াত আব্দুল কদ্দুস শেখ, মা জুলেখা খাতুন। তিন বোন ও দুই ভাই তারা। সংসারে পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলের জনক তিনি।
স্থানীয়ভাবে অনেকেই তাকে ‘ডোম’ বলে ডাকেন। গত ৩৫ বছর ধরে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অপমৃত্যুর মরদেহ মর্গে পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান কাজ। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ধর্ম-বর্ণ বা নাম-গোত্রহীন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মরদেহ তিনি নিজ হাতে বহন করে নেত্রকোণা মর্গে নিয়ে গেছেন।
বাবুল শেখ বলেন, ‘১৯৮৮ সালের বন্যার সময় লাশ উদ্ধার ও বহনের কাজ শুরু করি। প্রথম এ কাজ করি কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের আউজিয়া বাইঙ্গনি এলাকায় ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিলেন এক ব্যক্তি, তার লাশ বহনের মাধ্যমে। মাসকা ইউনিয়ন পরিষদের তখনকার চেয়ারম্যান মো. জহুরুল আলম ভূঁইয়া স্বপন চেয়ারম্যানের আহ্বানে ছুটে গিয়েছিলাম সেখানে, সেই থেকে শুরু।’
আঙুলে গুনে ও মনে মনে হিসেব করে বাবুল শেখ বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ লাশ বহন করেছি। দিন কিংবা রাতে, ঝড়-বাদল যে কোনো পরিস্থিতিতে সিএনজি চালিত গাড়ি দিয়ে লাশ আনা-নেওয়া করি। পুলিশ বা লাশের স্বজনদের কাছ থেকে যখন যা পারিশ্রমিক পাই তা-ই নিই। এমনও হয়েছে নিজের হাত থেকে উল্টো খরচও দিয়েছি।’
প্রথম প্রথম ভয় লাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লাশ বহনের কাজ করতে গিয়ে প্রথম প্রথম কিছু ভয় পেলেও এখন আর ভয় পাই না।’ এখন তিনি পুলিশের সঙ্গে মিলে মরদেহের প্রাথমিক সুরতহালও করেন। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাধা ও ঘৃণার মুখে পড়তে হয়েছে অনেকবার। তবে এখন আর কেউ কিছু বলে না।
আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে আক্ষেপের সুরে বাবুল শেখ বলেন, ‘প্রায় ৫/৭ মাস আগে ১ লাখ টাকা ঋণ করে ও অনেকের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে দেড় লাখ টাকায় লাশ টানার একটি সিএনজি গাড়ি ক্রয় করেছিলাম। ঋণের কিস্তি দিতে খুব কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর আর্থিক অনুদানের জন্য আবেদন করেছি, এখনো কিছু হয়নি। অপেক্ষায় আছি নতুন বছরের জন্য, দেখি কী হয়।’
লাশ বহন ছাড়া অন্য আয়ের পথ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যে গাড়িতে লাশ আনা-নেওয়া করি, সেই গাড়িতে যাত্রী ওঠে না। তাই ভাড়া করে অন্যের গাড়িতে যাত্রী আনা-নেওয়া করেও কিছু আয়-রোজগার করে টেনেটুনে সংসার চালাই।’
দীর্ঘ ১৫ বছর কেন্দুয়া থানা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ সময় আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে মামলা-মোকদ্দমায় হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে পুলিশের সঙ্গে সব সময়ই তার বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক থাকায় বড় কোনো অসুবিধা হয়নি।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘মো. বাবুল শেখ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। কেন্দুয়া পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর একটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমরা ডাকলে সব সময়ই তাকে পাই।’
বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমদাদুল হক তালুকদার বাবুল শেখের আর্থিক আবেদনের বিষয়ে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আর্থিক অনুদান দেওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া বিষয়টি সরকারি নিয়মের ভেতরও পড়ে না।’





















