সারাদেশ

মোহনগঞ্জে শিল্পকলার চর্চা নেই, ৫০ কোটি টাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও তালাবদ্ধ

  সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৪:৪৬:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় গান, তবলা, আবৃত্তি ও নাটকের চর্চায় মুখর ছিল নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ। আশি ও নব্বইয়ের দশকে শিল্প-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিতি ছিল এ উপজেলার। তবে দেড় যুগ ধরে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় সাংস্কৃতিক চর্চা প্রায় বিলুপ্তির পথে। দ্রুত একাডেমির কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

শুধু কার্যক্রম বন্ধ নয়, একসময় শিল্পকলা একাডেমিতে থাকা হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রেরও কোনো হদিস নেই। বিভিন্ন সময়ে একাডেমির নামে আসা সরকারি বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়েও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ নামে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। উপজেলা পরিষদের একটি হলরুম এ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ছিল। পদাধিকারবলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সভাপতি এবং একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক করা হতো। পরে এটি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে রূপ নেয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আশি ও নব্বইয়ের দশকে মোহনগঞ্জে গান, নাটক, আবৃত্তি ও বাদ্যযন্ত্র চর্চার ব্যাপক আয়োজন ছিল। কিন্তু ২০১০ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়লে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

২০২১-২২ সালের দিকে একাডেমির কার্যক্রম আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য ফরমও ছাড়া হয়েছিল। তবে সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে জানান অমল সরকার।

তিনি বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির কমিটি গঠনের পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়েছে। ইউএনও সভাপতি এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা সদস্যসচিব থাকেন। তাঁরা শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের কতটা চেনেন? সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’

বারহাট্টাসহ কয়েকটি উপজেলায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন অমল সরকার। তাঁর দাবি, মোহনগঞ্জেও একইভাবে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

এদিকে একসময় মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও অন্যান্য দামি বাদ্যযন্ত্র ছিল। বিভিন্ন সরকারের সময় একাডেমির জন্য বড় অঙ্কের সরকারি বরাদ্দও এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু বর্তমানে এসব বাদ্যযন্ত্রের বেশির ভাগেরই কোনো হদিস নেই।

অমল সরকার বলেন, ‘কোন বাদ্যযন্ত্র কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, তা কেউ জানেন না। কিছু জিনিস কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও শুনেছি। ইউএনওর প্রশাসনিক ভবনের পরিত্যক্ত মালপত্রের গুদামে কিছু বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।’

২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমির কক্ষে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সূর্যমুখী থিয়েটার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। ৫ আগস্টের পর সংগঠনটি ওই কক্ষ ছেড়ে যায়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, বর্তমানে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধই বলা যায়। আগে কবি রইস মনরমের বাসায় সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। সেটিও এখন কমে গেছে। তিনি নিজ বাসায় স্বল্প পরিসরে সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।

হাওরাঞ্চলের কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরম বলেন, ‘আগের সেই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অঙ্গন আবার দেখতে চাই। তরুণদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা দরকার। এতে তাদের মনের বিকাশ ঘটবে এবং মানবিক মূল্যবোধ তৈরি হবে।’

তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও বাড়াতে হবে। তরুণেরা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকলে মাদক থেকেও দূরে থাকবে।

অমল সরকার বলেন, নতুন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই। মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বাঁচাতে দ্রুত শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, শিল্পকলা একাডেমির বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বর্তমানে কোথায় আছে, তা তিনি জানেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারাদেশেই শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর আগে প্রতি বছর শিল্পকলা একাডেমির জন্য সরকারি বরাদ্দ আসত। সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

ইউএনও আরও বলেন, কিছুদিনের মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে, শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ২০২৩ সালে মোহনগঞ্জে নির্মাণ করা হয়েছে শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সোয়া দুই একর জমির ওপর নির্মিত এ কেন্দ্রে রয়েছে তিনতলা একাডেমি ভবন, মিলনায়তন, জাদুঘর, ৩১০ আসনের মাল্টিপারপাস কনফারেন্স হল ও মুক্তমঞ্চ।

রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি চর্চার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রটি। কিন্তু নির্মাণের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে এখনো কোনো আয়োজন করা যায়নি। তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

আরও খবর

Sponsered content