প্রতিনিধি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:৪৮:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামে এইচআইভি (এইডস) সংক্রমণের অন্যতম বড় ও ‘অদৃশ্য’ উৎসে পরিণত হচ্ছেন বিদেশফেরত প্রবাসী ও তাঁদের পরিবার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—এই অঞ্চলে শনাক্ত হওয়া এইচআইভি রোগীদের একটি বড় অংশ প্রবাসী, বিদেশফেরত শ্রমিক অথবা তাঁদের স্ত্রী-সন্তান।
চমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল (নভেম্বর ২০২২–অক্টোবর ২০২৫) পর্যন্ত এআরটি সেন্টারে মোট ২১৭ জন নতুন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছে, আর মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। এর মধ্যে
একই সময়ে স্বামী থেকে স্ত্রী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রয়েছে ১২ জনের, সাধারণ জনগোষ্ঠী থেকে ২৬ জন, এবং পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। একজন যৌনকর্মী ও একজন শিশু রোগীও রয়েছে এই তালিকায়।
মৃত্যুর ক্ষেত্রেও প্রবাসফেরত শ্রমিকরা এগিয়ে—২০২৩ সালে মারা যাওয়া ২৭ জনের মধ্যে ১৫ জনই ছিলেন প্রবাসফেরত বা তাঁদের পরিবারের সদস্য। পরের দুই বছরেও তাঁদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থানকালে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়ান। দেশে ফেরার পর পরীক্ষা না করানো এবং সচেতনতার অভাবেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবারের সদস্যরা অজান্তেই আক্রান্ত হচ্ছেন।
চমেকের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের প্রধান ডা. জুনায়েদ মাহমুদ খান বলেন,
“বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ এবং দেশে ফিরে পরীক্ষা না করার কারণে সংক্রমণ বাড়ছে। বেশিরভাগ রোগী শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসায় প্রাণহানি রোধ করা যায় না।”
তিনি জানান, মোট শনাক্ত রোগীদের মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্যও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য এইচআইভি স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা এবং দেশে ফেরার পর পুনরায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট ডা. মো. লুৎফুর রহমান রাহাত বলেন,
“বিদেশফেরত প্রবাসী, তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। অজ্ঞতা, পরীক্ষা না করানো এবং সামাজিক লজ্জাই মূল বাধা। তথ্য গোপন না করে সচেতন হলে এইচআইভি থেকে সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।”
জাতীয় পর্যায়ের তথ্যানুসারে, দেশে এ পর্যন্ত ২৩টি জেলাকে এইডস ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। জাতিসংঘের হিসেবে দেশে প্রায় ১৩,২০০ জন এইডসে আক্রান্ত, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এএইচএসপি প্রোগ্রামে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৫,৮৬৫।
চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, সাতকানিয়া ও সীতাকুণ্ডে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—স্থানীয় সংক্রমণের বড় উৎস প্রবাসফেরত শ্রমিকরা। কাছাকাছি অঞ্চল কক্সবাজার, ফেনী, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও নোয়াখালী থেকেও এ রোগী শনাক্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, তথ্য গোপন ও সামাজিক কুসংস্কার এইচআইভি শনাক্তের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রবাসী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না করা গেলে চট্টগ্রাম এবং উপকূলীয় অঞ্চলে এ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।




















