আন্তর্জাতিক

ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন অভিযানের সম্ভাবনা কতটা বাস্তব?

  প্রতিনিধি ১৬ জুলাই ২০২৬ , ২:৪৯:৫০ প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বন্দর আব্বাসসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতেও অব্যাহত রয়েছে মার্কিন অভিযান। এই ধারাবাহিক হামলার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওয়াশিংটন কি শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি করছে, নাকি ইরানের কোনো ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনাও করছে?

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের শুরু থেকেই এমন আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। গত মার্চে যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরানের খার্গ দ্বীপে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল পেন্টাগন। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশ এই দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়। তবে ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সেই আলোচনা কিছুটা থেমে যায়। কিন্তু সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কোনো অভিযানের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ না করায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারি না, কারণ বললে সেটি বোকামি হবে।’ এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল চাপ তৈরির কৌশল, নাকি সত্যিই ইরানের ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে?

ইরানের দ্বীপ দখলের কতটা সক্ষমতা আছে যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু ছোট দ্বীপ দখল করতে পারে। তার ভাষ্যমতে, পর্যাপ্ত বিমান, নৌ ও উভচর বাহিনী ব্যবহার এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকলে এমন অভিযান সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। এসব সেনা বড় স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি বিভিন্ন অগ্রবর্তী ঘাঁটিতেও অবস্থান করছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাদের হাশেমিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ দখল ও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বজায় রাখার সামরিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো এই অভিযানের মূল্য কত হবে।

ক্রিগ বলেন, কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর সেটিকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

তার মতে, ইরানের কেশম দ্বীপ দখল করা কঠিন হবে। কারণ এটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে অবস্থিত এবং বড় আকারের একটি দ্বীপ। অন্যদিকে ছোট দ্বীপগুলো তুলনামূলক সহজে দখল করা গেলেও সেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ হামলার আওতার মধ্যেই থাকবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, একাধিক দ্বীপ দখলের চেষ্টা হলে সেটি আর সীমিত অভিযান থাকবে না; বরং তা বড় ধরনের উভচর সামরিক অভিযানে রূপ নেবে।

দ্বীপ দখল কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কোনো দ্বীপ দখল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ক্রিগের ধারণা, সীমিত পরিসরের অভিযানেও শুরুতে প্রয়োজন হতে পারে ৫ থেকে ১০ হাজার সেনা। এর মধ্যে যুদ্ধরত সেনাদের পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রকৌশলী, চিকিৎসা ও রসদ সরবরাহকারী ইউনিটও থাকবে।

তিনি বলেন, এসব সেনাকে ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে সরাসরি হামলার ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে। রসদবাহী জাহাজ, হেলিকপ্টার ও অবতরণযানকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-মাইন ও কামানের হামলার ঝুঁকি নিয়েই চলতে হবে।

ক্রিগের মতে, ইরান চাইলে সরাসরি দ্বীপ পুনর্দখলের পরিবর্তে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে মার্কিন অবস্থানকে ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে অধ্যাপক নাদের হাশেমি মনে করেন, বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ দখলের মতো কোনো অভিযান চালানোর সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ এতে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরানের মূল ভূখণ্ড দখলের সম্ভাবনা কতটা?

তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের মূল ভূখণ্ডেও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে পারে। অতীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ সেনা মোতায়েন করেছিল ওয়াশিংটন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব। কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়বে এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। নাদের হাশেমির ভাষায়, ‘এগুলো মূলত তাত্ত্বিক আলোচনা, বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।’

ইরানের প্রতিরক্ষা ভাঙা কতটা সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কোনো দ্বীপ দখল করতে হলে প্রথমেই দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করতে হবে। তবে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তা স্থায়ীভাবে সম্ভব নয়।

ইরানের অনেক রাডার, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন ঘাঁটি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টার মোবাইল গোপন অবস্থানে রয়েছে।

ক্রিগ বলেন, বিমান হামলার মাধ্যমে সাময়িকভাবে হুমকি কমানো গেলেও সেটি ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালাতে হবে। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা বন্ধ করতে শুধু দ্বীপ দখল যথেষ্ট নয়; বরং ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে হবে। আর তখন সেটি আর দ্বীপ দখলের অভিযান থাকবে না, বরং বড় ধরনের স্থলযুদ্ধে পরিণত হবে।

হরমুজ প্রণালি, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের কোনো দ্বীপ দখল করে, তাহলে তেহরান এটিকে বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-মাইন পাতা, জাহাজে হামলা, মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যেতে পারে। এতে জাহাজের বীমা খরচ বাড়বে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।

ক্রিগের মতে, ইরানের দ্বীপ দখল সামরিকভাবে বড় সাফল্য হিসেবে দেখানো গেলেও, এটি নৌ চলাচল রক্ষার অভিযানকে দ্রুতই ভূখণ্ড দখলের যুদ্ধে পরিণত করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা এড়িয়ে চলাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।

আরও খবর

Sponsered content