প্রতিনিধি ৪ নভেম্বর ২০২৬ , ৪:৩৮:৪৮ প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সক্ষমতা ও সামর্থ্য বিবেচনা করে ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবন এবং শিল্প-কলকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে সরকার।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এ ‘লিডিং বাই এক্সাম্পল: স্কেলিং রুফটপ সোলার ইন পাবলিক সেক্টর’ শীর্ষক সেমিনারে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা কোনো আকস্মিক ভাবনা নয়, বরং বহু বছর আগেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বারবার বলেছেন, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎখাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হলে সৌরশক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির স্বার্থে সৌরবিদ্যুৎকে সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর সেই দূরদর্শী ভাবনা আজ জাতীয় নীতিমালায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন আগে কেবল সৌরশক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেননি, বরং দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি তাঁর নিজের বাসভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা মনে করিয়ে দেন, দুই দশকেরও বেশি সময় আগে বিএনপি যখন শেষবার সরকার পরিচালনায় ছিল, তখনও বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ এতটা জনপ্রিয় ছিল না। তা সত্ত্বেও তৎকালীন বিএনপি সরকার এই পরিবেশবান্ধব শক্তির প্রসারে নানা নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
একটি ভবিষ্যৎমুখী সরকার হিসেবে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানিখাতকে বহুমুখী করা জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুতের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে আজকের এই এক্সপো অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ।
সৌরবিদ্যুতের এই প্রসারকে একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সফল করতে সরকারের প্রতিটি সংস্থাকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে দেশের তরুণ সমাজকে সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও দেশীয় শিল্প বিকাশে সরকারের বিশাল কর্মপরিকল্পনা
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারের এক বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ছয় মাসের মধ্যে উপযুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ বা অব্যবহৃত খালি জায়গা চিহ্নিত করে সৌরবিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও সম্ভাব্যতায় একটি সুনির্দিষ্ট ফিজিবিলিটি স্টাডি করা আমাদের প্রথম লক্ষ্য, যাতে নির্ধারণ করা যায় কোথায় কার্যকরভাবে সৌরবিদ্যুৎ চালু করা সম্ভব। ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে এবং উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
উচ্চশিক্ষার অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, দেশের চলমান ৫০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টিরও অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা প্রক্রিয়া অনুযায়ী এগোচ্ছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খুব স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে সোলার সুবিধা ছিল। এ খাতে যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে তাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হবে।।
তবে সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মূল কাজটি করবে বেসরকারিখাত। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পুঁজি ব্যবস্থাপনার সুযোগসহ একটি অনুকূল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল প্রায় শতভাগ আমদানি-নির্ভর। দেশে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও ভ্যালু চেইনে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটেই সোলার শক্তির বিকাশ ও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরিতে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের এই নতুন শিল্পকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ সমাজকে কাজে লাগাতে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষ ও যোগ্য কর্মী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া হবে, যেন তারা কেবল ব্যবহারকারী বা উৎপাদক হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র সাপ্লাই চেইন ও দক্ষ কর্মিবাহিনীর প্রসারে নেতৃত্ব দিতে পারে।
ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ‘সোলার বিপ্লব’ সফল করার আহ্বান
দেশে কাঙ্ক্ষিত ‘সোলার বিপ্লব’ সফল করতে বসতবাড়ি, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ সব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সৌরশক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, জাতীয় বাজেটেও সৌরবিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও সহায় প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারিখাতকে এ খাতে এগিয়ে আসার জন্য বহুমুখী সুযোগ ও বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার।
তিনি বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় আগামী দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেকে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প কারখানা পর্যায়ে নিজ নিজ উদ্যোগে সৌরশক্তিকে গ্রহণ করতে হবে। নিজ বাড়ির ছাদ, কারখানার ছাদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চত্বরের খালি জায়গাগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারে ইতোমধ্যে একটি অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি যার যার অবস্থান থেকে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে দেশের জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
মাহ্দী আমিন উল্লেখ করেন, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে দেশে যে বৃহৎ পরিবর্তন ও সোলার বিপ্লব সাধন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে সরকারের মূল ভূমিকা হলো নীতিগত সহায়তা প্রদান করা। তবে এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের নীতি সহায়তার সাথে বেসরকারিখাত ও সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রয়াস যুক্ত হলেই কেবল দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি স্বনির্ভরতা নিশ্চিতকরণে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুল হক, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কৃষিদবিদ মো. হাসান জফির তুহিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর আকিরা মাতসুনাগা ও সোলারিকের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার।





















