মো: সাকিব চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৮:৩৫:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ
উত্তরাঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে শীতের প্রকোপ। রংপুর বিভাগের নীলফামারীর ডিমলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। তীব্র ঠান্ডা, হিমেল হাওয়া ও ঘন কুয়াশার কারণে জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে শীতের এই দাপটে নগরী ও গ্রামীণ এলাকায় গরম কাপড়, জুতা ও অন্যান্য শীতকালীন পণ্যের কেনাবেচা জমে উঠেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী মানুষ।
রংপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল থেকে শহরের অলিগলি—সবখানেই শীতের প্রভাব পড়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার তীব্রতা বাড়ছে, যা সকাল ১১টা পর্যন্ত স্থায়ী থাকছে। গত চার দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলছে অল্প সময়ের জন্য। সন্ধ্যার পর হিমেল বাতাসে শীতের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে এলাকা, ফলে দৃষ্টিসীমা কমে গিয়ে সড়কে যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। হাটবাজার ও দোকানপাট দেরিতে খুলছে।
দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই খড়কুটো বা কাঠ জ্বালিয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করলেও তীব্র হাওয়ার কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) নীলফামারীর ডিমলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া রংপুরে ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১১ ডিগ্রি, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ১২ ডিগ্রি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ দশমিক ১ ডিগ্রি, লালমনিরহাটে ১২ ডিগ্রি এবং গাইবান্ধায় ১২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে। দিনের বেলায় রোদের উষ্ণতা থাকলেও রাত ও ভোরে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।
স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আগামী কয়েকদিন কুয়াশার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে, যা তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দেবে। জানুয়ারির ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও ঢাকা বিভাগে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, পরিবহন ও কৃষি খাতে প্রভাব পড়তে পারে।
শীতের এই তীব্রতা স্বাস্থ্য খাতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও শিশু বিভাগে রোগীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। শিশু, বয়স্ক ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন সর্দি, কাশি, জ্বর, কোল্ড ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জামাল উদ্দিন বলেন, “দিনে গরম ও রাতে ঠান্ডার তারতম্যের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে গরম কাপড় পরা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান ও মাস্ক ব্যবহার জরুরি। দীর্ঘদিন কাশি বা শ্বাসকষ্ট থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।”
এদিকে শীতের কারণে স্থানীয় বাজারে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। রংপুর নগরীর শপিংমল থেকে ফুটপাতের দোকান পর্যন্ত গরম কাপড়, সোয়েটার, জ্যাকেট, মোজা ও জুতার বিক্রি বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা ভিড় করছেন পুরাতন কাপড়ের দোকানে।
জাহাজ কোম্পানি মোড়ের একটি জুতার শোরুমের বিক্রয়কর্মী শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, “কয়েকদিন ধরে জুতার বিক্রি বেড়েছে। শিশু থেকে বয়স্ক—সবাই কিনছেন। আশা করছি চলতি শীতে ভালো ব্যবসা হবে।”
রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলায় শীতার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য শীতবস্ত্র বরাদ্দ এসেছে এবং বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়রা প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি শীতজনিত স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।




















