দিনাজপুর প্রতিনিধি: ১৩ জুলাই ২০২৬ , ৯:০৩:২০ প্রিন্ট সংস্করণ
দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের পেশকার আবু সালেকের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি নথি জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে এক ব্যক্তির জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে দেওয়া, পুরনো পর্চা পরিবর্তন করা এবং সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত রয়েছেন তিনি।
বিভিন্ন ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ তাকে হাকিমপুর থেকে নবাবগঞ্জ উপজেলায় বদলি করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু বদলি নয়, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নবাবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি মৌজার সেটেলমেন্ট কার্যক্রম হাকিমপুর অফিসের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। এসব এলাকায় বন বিভাগের বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আবু সালেক অর্থের বিনিময়ে এসব সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করে দিয়েছেন।
এছাড়া ভলিউম (রেকর্ড বই) থেকে পুরোনো পর্চা ছিঁড়ে নতুন পর্চা সংযুক্ত করে সরকারি জমি বেসরকারি মালিকানায় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের আলামত হিসেবে ছেঁড়া পর্চার অংশবিশেষ সংরক্ষণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির মাধ্যমেও এসব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী হিলির চণ্ডীপুর এলাকার নুকুল কুমার বসাক বলেন, তাঁর জমি ভুলভাবে বড় ভাইয়ের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ৪২(ক) ধারায় মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, পরে আবু সালেক এক লাখ টাকা দিলে রেকর্ড সংশোধনের আশ্বাস দেন। তিনি টাকা দিতে না পারায় এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি।
একই এলাকার হাজেরা বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর শ্বশুর দুই ছেলের নামে সমানভাবে জমি দলিল করে দিলেও পরে তাঁর স্বামীর অংশটুকুও অন্যপক্ষের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চললেও এখনো সমাধান হয়নি।
হিলি সিপি এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল মল্লিক বলেন, সড়কের পাশে তাঁর ১৫ শতক জমির বৈধ কাগজপত্র, খাজনা ও খারিজ থাকা সত্ত্বেও সেটি অন্য একজনের নামে রেকর্ড করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না আবু সালেক। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ ২৪ থেকে ২৫ বছর একই অফিসে কর্মরত থেকে তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন এবং পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমানে নবাবগঞ্জ উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে কর্মরত পেশকার আবু সালেক বলেন, “এসব বিষয় এক জায়গায় বসে আলোচনা করা হবে।”
নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বলেন, “বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটি সেটেলমেন্ট বিভাগের বিষয় হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হবে। তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মিজ মেহেনুম তারান্নুম বলেন, “তাকে ইতোমধ্যে নবাবগঞ্জ উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।





















