প্রতিনিধি ১৩ জুলাই ২০২৬ , ৫:৪৩:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১৩ জুলাই। দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার চলে যাওয়া ছিল দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য এক গভীর ক্ষতি। তবে মানুষটি চলে গেলেও তার কর্ম, প্রতিষ্ঠান, স্বপ্ন এবং হাজারো মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া অবদান আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণে স্মরণীয় নয়; তারা স্মরণীয় হন একটি সময়কে বদলে দেওয়ার সাহস, নতুন পথে হাঁটার দৃঢ়তা এবং মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করার মানসিকতার কারণে। নুরুল ইসলাম ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেননি, গড়ে তুলেছিলেন কর্মসংস্থান, উৎপাদন, গণমাধ্যম, আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা-চেতনার এক বিশাল পরিসর।
১৯৪৬ সালের ৩ মে ঢাকার নবাবগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন নুরুল ইসলাম। সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে তিনি নিজের মেধা, পরিশ্রম, সাহস এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম সফল শিল্পোদ্যোক্তা। জীবনের শুরুতে তার হাতে হয়তো বড় পুঁজি ছিল না, কিন্তু ছিল বড় স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কঠোর পরিশ্রম, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং দেশকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার।
নুরুল ইসলাম ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীনতার পর নতুন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার শিল্প, দরকার উৎপাদন, দরকার বিনিয়োগ এবং দরকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজের উদ্যোক্তা জীবনের পথ তৈরি করেন। তার কাছে ব্যবসা শুধু মুনাফার হিসাব ছিল না; ব্যবসা ছিল দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম, মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার একটি দায়িত্ব।
১৯৭৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা গ্রুপ। একটি উদ্যোগ থেকে ধীরে ধীরে যমুনা গ্রুপ পরিণত হয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে। টেক্সটাইল, উৎপাদন, রিয়েল এস্টেট, ইলেকট্রনিকস, কেমিক্যাল, বেভারেজ, মিডিয়া ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয় যমুনার কার্যক্রম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পগোষ্ঠী শুধু ব্যবসার পরিধি বাড়ায়নি; দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত করেছে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা-আত্মবিশ্বাসের নতুন মাত্রা।
নুরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো কর্মীর জীবন, অসংখ্য পরিবারের জীবিকা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের আয়ের উৎস নয়; এটি একটি পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। সেই অর্থে নুরুল ইসলামের কর্মজীবনের সাফল্য কেবল প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিটে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে আছে মানুষের ঘরে ঘরে।
যমুনা গ্রুপের বিস্তৃত শিল্প কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামোতেও নুরুল ইসলাম রেখে গেছেন বড় ছাপ। যমুনা ফিউচার পার্ক তার দূরদর্শী চিন্তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি শুধু একটি শপিং মল নয়; এটি আধুনিক নগরজীবন, বাণিজ্য, বিনোদন এবং সেবা খাতের একটি বড় প্রতীক। এমন একটি বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে চিন্তা করার সাহস এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনার ওপর গভীর বিশ্বাস।
শিল্পের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও নুরুল ইসলামের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক যুগান্তর এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দেশের সংবাদমাধ্যমে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেন। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মাধ্যমে মানুষের কাছে তথ্য, সংবাদ, বিশ্লেষণ এবং জনমত পৌঁছে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া—সেখানে তার বিনিয়োগ ও উদ্যোগ গণমাধ্যম খাতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একজন শিল্পোদ্যোক্তার দৃষ্টিতে গণমাধ্যম ছিল শুধু আরেকটি ব্যবসায়িক ক্ষেত্র নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নুরুল ইসলাম ছিলেন ঝুঁকি নিতে জানেন এমন একজন উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বাজারের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে তিনি নতুন সম্ভাবনায় রূপ দিতে চেয়েছেন। তার নেতৃত্বে যমুনা গ্রুপ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে পৌঁছায়, যা দেশের শিল্পায়নের আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব পায়।
তার জীবনের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—স্বপ্ন দেখতে হলে তা বড় করেই দেখতে হয়। ছোট পরিসরের উদ্যোগ থেকেও একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে, যদি নেতৃত্বে থাকে সততা, সাহস, পরিশ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নুরুল ইসলাম সেই বাস্তব উদাহরণ রেখে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারাও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে, বড় প্রতিষ্ঠান গড়তে পারে এবং বিশ্বমানের অবকাঠামো নির্মাণের সাহস রাখতে পারে।
২০২০ সাল ছিল বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির কঠিন সময়। সেই সময় নুরুল ইসলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে শোক নেমে আসে শিল্প, ব্যবসা, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাঝে। দেশের উদ্যোক্তা সমাজ হারায় একজন সাহসী পথপ্রদর্শককে। কিন্তু একজন স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যু তার স্বপ্নের মৃত্যু নয়; বরং তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান এবং আদর্শের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকেন।
আজ তার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পোদ্যোক্তাকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক সংগ্রামী অধ্যায়কে স্মরণ করা। এটি সেই মানুষটিকে স্মরণ করা, যিনি বিশ্বাস করতেন—দেশকে এগিয়ে নিতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে, মানুষের হাতে কাজ তুলে দিতে হবে, সাহসী বিনিয়োগ করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখাতে হবে।
নুরুল ইসলামের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার অর্জিত সম্পদে নয়, তার রেখে যাওয়া কাজে। তিনি যে প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, যে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেছেন, যে আধুনিক অবকাঠামোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন—সবই তার কর্মময় জীবনের সাক্ষ্য বহন করে।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ কর্মের মধ্য দিয়ে থেকে যান। নুরুল ইসলাম সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের স্বপ্নকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; সেই স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিয়েছেন হাজারো মানুষের জীবনে। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা সেই স্বপ্নদ্রষ্টা শিল্পনায়কের প্রতি।
আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।





















