সিলেট প্রতিনিধি: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:০৭:১২ প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত লাল শাপলা বিল কচুরিপানার আগ্রাসনে তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। পরিবেশ সংগঠকদের মতে, কচুরিপানার বিস্তার অব্যাহত থাকলে অচিরেই বিলের স্বাভাবিক প্রাণপ্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা অবিলম্বে পরিবেশের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কচুরিপানার আগ্রাসন রোধ ও শাপলা বিল সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল শনিবার (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে ডিবির হাওরের শাপলা বিল ও জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন দলে আরও ছিলেন জার্মান প্রবাসী লেখক ও ঐতিহ্য গবেষক সাকি চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, ধরা সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট গোলাম সোবাহান চৌধুরী।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জৈন্তিয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন মো. হানিফ প্রতিনিধি দলকে স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘তরুছায়া প্রকল্প’ সম্পর্কে অবহিত করেন। এ প্রকল্পের আওতায় বিলের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় তিন হাজার গাছ লাগানো হয়েছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা শাপলা বিল এলাকা পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, যেভাবে কচুরিপানার বিস্তার ঘটছে, তাতে অচিরেই বিলের সার্বিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মতবিনিময়কালে ডিবির হাওরের রাস্তার পাশে রোপণ করা কিছু গাছ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও অভিমত দেওয়া হয়। এ সময় রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং শাপলা বিলের প্রাণপ্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কচুরিপানাসহ অন্যান্য আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি হিজল, করচ, তাল, সুপারি প্রভৃতি দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা ডিবির হাওরের একাংশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভোরের আলোয় ফুটন্ত লাল শাপলা দেখতে পান। ২০১৬ সালের দিকে বিষয়টি স্থানীয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে এর সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছরই বাড়ছে পর্যটকদের আগমন। জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শাপলা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সূর্যোদয় থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ এখানে পর্যটকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি।
প্রতিনিধি দলের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এই লাল শাপলা বিলকে কেন্দ্র করে শুধু প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রই নয়, বরং ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন শিল্পও বিকশিত হতে পারে। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিলটি বহন করছে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতি। ১৭৮৭ সালের দিকে রাজা বিজয় সিংহকে হরফকাটা ও ডিবি বিলের মধ্যস্থলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। ওই স্থানেই প্রতিষ্ঠা করা হয় তাঁর সমাধিসৌধ।
সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর প্রতিনিধি দল প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো সমাধিসৌধটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে মর্মাহত হন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা দ্রুত সমাধিসৌধটি সংরক্ষণের দাবি জানান। একই সঙ্গে সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে রাজা বিজয় সিংহের হৃদয়বিদারক প্রয়াণ ও সংশ্লিষ্ট অসম প্রেমের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরতে একটি বিলবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
প্রতিনিধি দল পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শাপলা বিল ও এর আশপাশের এলাকা ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তারা পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন।




















