প্রতিনিধি ২ জুলাই ২০২৬ , ৯:৪৪:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শিশুটির নাম ক্লেইবার মোরান। তাকে উদ্ধারের ঘটনাকে দুর্যোগের মধ্যে আশার আলো হিসেবে দেখছেন দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ক্লেইবার মোরানের খালা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভাগ্নেকে ফিরে পেয়ে তিনি ভীষণ আনন্দিত। একই সঙ্গে তার আশা, শিশুটির মা-বাবাও এখনও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হবেন।
মঙ্গলবার ভোরে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জর্ডানের উদ্ধারকারী দল ক্লেইবারকে জীবিত উদ্ধার করে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই উদ্ধারকে ‘আমাদের জনগণের জন্য আশার উৎস’ বলে উল্লেখ করেছেন। গত বুধবারের দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
২৩ বছর বয়সী ক্লেইবারের খালা আন্দ্রেইনা সারমিয়েন্তো বিবিসিকে বলেন, ‘আমার বোন ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি মায়ের স্নেহ দিয়ে ক্লেইবারের যত্ন নেব। আমরা সবাই চাই, সে যেন ফিরে আসে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে অনেক প্রার্থনা করছি, যেন তিনি আমাকে শক্তি দেন। কারণ ওর বয়স মাত্র দুই বছর, আর আমি নিজে মা নই।’ রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে ক্লেইবারের শয্যার পাশে বসে তার হাত ধরে এসব কথা বলেন তিনি।
আন্দ্রেইনা আরও বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার বোন সব সময় বলত, ক্লেইবার আমারও ছেলে। এখন মনে হচ্ছে, সে যেন ওকে আমার কাছে রেখে বলছে ‘এখন থেকে ও তোমার ছেলে, ওর দায়িত্ব তোমার।’
লা গুয়াইরায় থাকা এক বন্ধু যখন ফোন করে ক্লেইবারের জীবিত উদ্ধারের খবর দেন, তখন আনন্দে তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। এরপরই তিনি ভাগ্নের সঙ্গে দেখা করতে রওনা হন।
আন্দ্রেইনা জানান, জর্ডানের উদ্ধারকারী দলের আগে যুক্তরাজ্যের উদ্ধারকারীরাও ক্লেইবারকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত জর্ডানের দলই তাকে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হয়।
দীর্ঘ ছয় দিন পর ভাগ্নের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তে ক্লেইবার আন্দ্রেইনার দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘ওই তো আন্টি।’
আন্দ্রেইনা জানান, হাসপাতালে আনার পর ক্লেইবার ‘প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে ছিল। সে শুধু চিৎকার করছিল।’ তবে সারা রাত ঘুমানোর পর বুধবার তার অবস্থার উন্নতি হয় এবং সে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘আজ সে আমাকে ছোট ছোট চুমু দিচ্ছে, আমার সঙ্গে কথা বলছে, এমনকি শরীরের কোথায় ব্যথা করছে সেটাও বলছে।’
আন্দ্রেইনা এসব কথা বলার সময় ক্লেইবার তার পাশেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিল। স্পাইডারম্যানের নকশা করা একটি কম্বলে মোড়া শিশুটিকে ঘিরে ছিল নানা খেলনা। সে বিছানার ওপর একটি ছোট খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছিল। একই ওয়ার্ডে ভূমিকম্প থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া আরও কয়েকজন শিশুও চিকিৎসাধীন ছিল।
হাসিমুখে আন্দ্রেইনা বিবিসিকে বলেন, ‘ওর শরীরে একটি হাড়ও ভাঙেনি। সবকিছুই ভালো আছে। শুধু হাত ও পায়ে কয়েকটি আঁচড় রয়েছে, এর বাইরে আর কোনো গুরুতর আঘাত নেই।’
তবে ভাগ্নেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আনন্দের মধ্যেও বোনের খোঁজ না পাওয়ার কষ্টে ভেঙে পড়েছেন তিনি। আন্দ্রেইনা বলেন, ‘ভাগ্নেকে ফিরে পেয়ে আমি খুব খুশি। কিন্তু আমার বোনকে খুঁজে না পাওয়ার কষ্টটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়ে দিচ্ছে।’
আন্দ্রেইনা জানান, তার ৩১ বছর বয়সী বড় বোন আনা লুসের সঙ্গে তার ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্রতিদিনই তারা ভিডিও কলে কথা বলতেন। আর সেই সময় ক্লেইবার সবসময়ই মায়ের পাশেই থাকত।
তিনি বলেন, আমার বোন যেখানে যেত, তার ছেলেও সেখানেই যেত। ক্লেইবার যা চাইত, সে তা পূরণ করার চেষ্টা করত। টাকা না থাকলেও আমাকে ফোন করে বলত, ‘ক্লেইবার এটা চায়’ বা ‘ওর এটা দরকার।’
আন্দ্রেইনা আরও বলেন, ‘তিনি আমার বড় বোন। আমি সবসময় তাকে বিশ্বাস করতাম এবং নিজের সব সমস্যার কথা তার সঙ্গে ভাগাভাগি করতাম। ভিডিও কলে যখনই কথা বলতাম, ক্লেইবারকে তার পাশেই দেখতে পেতাম।’
তার বিশ্বাস, ভূমিকম্পের সময় ধ্বংসস্তূপের নিচেও তার বোন ক্লেইবারের পাশেই ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘যেভাবে আমার ভাগ্নেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই আমার বিশ্বাস, আমার বোন ও দুলাভাইকেও উদ্ধার করা হবে।’
ভাগ্নের দিকে স্নেহভরে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে ওর বেঁচে থাকার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই শিশুটি যখন বড় হবে, তখন এটাই হবে তার জীবনের গল্প।’
উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে নিহত হওয়ার সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ২৯৫ জনে পৌঁছেছে। ভূমিকম্পে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আরও বেশ কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বা তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্যের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত ২৪ জুন বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।




















