প্রতিনিধি ১৪ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৮:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ
মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যার স্বাদ একদিন প্রত্যেক মানুষকেই গ্রহণ করতে হবে। তাই ইসলামে মৃত্যুকে ভয় বা আতঙ্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার অনিবার্য যাত্রা হিসেবে দেখা হয়। ইসলামি শিক্ষায় দুনিয়ার জীবনকে একটি পরীক্ষাক্ষেত্র বলা হয়েছে, আর মৃত্যু সেই পরীক্ষার সমাপ্তি ও চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
ইসলামি দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত জীবন শুরু হয় মৃত্যুর পর। তাই একজন মুমিনের জন্য মৃত্যু কেবল জীবনের ইতি নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও প্রতিদানের পথে অগ্রসর হওয়ার একটি ধাপ।
দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষা
কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেনকে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ। তিনি পরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল।’ (সূরা আল-মুলক: ২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের দুনিয়ার জীবন মূলত একটি পরীক্ষা। সুখ-দুঃখ, প্রাচুর্য-অভাব, সুস্থতা-অসুস্থতা সবকিছুই এই পরীক্ষার অংশ। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলা এবং নেক আমলের মাধ্যমে পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
হাদিসে বর্ণিত আছে, মৃত্যুশয্যায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুনিয়ায় আরও কিছু সময় অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তার রবের সান্নিধ্যকেই বেছে নেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন মৃত্যুর মাধ্যমে (দুনিয়ার কষ্ট থেকে) মুক্তি লাভ করে।’ (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ, একজন ঈমানদারের জন্য মৃত্যু দুনিয়ার পরীক্ষা, কষ্ট ও দুঃখ-ক্লেশের অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম।
কেন মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে বলা হয়েছে?
ইসলামে মৃত্যুর কথা নিয়মিত স্মরণ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই হৃদয় লোহার মতো মরিচা ধরে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর পরিচ্ছন্নতা কীভাবে সম্ভব?’ তিনি বললেন, ‘মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে।’ (নাহজুল ফাসাহাহ)
আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন,‘বেশি বেশি স্মরণ কর সেই বিষয়টিকে, যা সব ভোগ-বিলাসের অবসান ঘটায় অর্থাৎ মৃত্যু।’ (জামে তিরমিজি)
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে মানুষ নিজের কাজের হিসাব-নিকাশ করতে শেখে এবং দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে থাকার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
মৃত্যুর স্মরণ লোভ কমায়
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করে, সে অল্প সম্পদেও সন্তুষ্ট থাকে। সে অতিরিক্ত সম্পদের লোভ করে না এবং কৃপণও হয় না।’ (বিহারুল আনওয়ার)
ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর সব সম্পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদা একদিন রেখে যেতে হবে। মৃত্যুর এই বাস্তবতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেই নিহিত।
ধর্মীয় শিক্ষাবিদদের মতে, মৃত্যুর স্মরণ একজন মুসলিমকে আত্মশুদ্ধি, নেক আমল এবং আখিরাতমুখী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। তাই মৃত্যু নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সৎকর্ম এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পরকালের প্রস্তুতি নেওয়াই ইসলামের শিক্ষা।









