মো: সাকিব চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার ১১ এপ্রিল ২০২৬ , ৬:৪৭:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর নগরীতে মাদক কারবারের দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রকাশ্যে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ফের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা ‘মুখ খুলছে না’ এমন অভিযোগ তুলে ঘটনাস্থল দাসপাড়ায় দোকান ও বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাত সোয়া ৮টার দিকে রংপুর নগরীর দাস পাড়া এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কিছু দেখেননি বলে জানালে ক্ষুব্ধ হয়ে নিহতের পক্ষের লোকজন হামলা চালায়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে নিহত রাকিবের পরিবারের দাবি, হামলার ঘটনার সময় তারা মরদেহ দাফন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এ সুযোগে মামলাকে ভিন্নখাতে নিতে হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত মমিনের জামাই সিফাতের নেতৃত্বে দাসপাড়ার হিন্দু বাড়ি ও দোকানপাটে হামলা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে হত্যার ঘটনাস্থল দাসপাড়া মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, এলাকার প্রায় ২০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। যে দোকানের সামনে তার মরদেহ পড়ে ছিল, সেখানে রক্তের ওপর ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি দোকানের ঝাঁপে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, কোনো কোনো দোকানের শাটার ভাঙা।
এ ছাড়া আশপাশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়ির টিনের বেড়া ভাঙা, জানালার থাই গ্লাস ভাঙা এবং গেটেও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি দল নিরাপত্তার দায়িত্বে অবস্থান করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল সন্ধ্যার পর রাকিবের লাশ রংপুর নগরের নূরপুরে দাফন করা হয়। এরপর রাত ৮টার দিকে ৪০–৫০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাছুয়াপাড়া মোড়ে গিয়ে স্থানীয় দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০টি দোকানের শাটার, বারান্দা এবং কমপক্ষে ১০টি বাড়ির গেট, জানালা ও বেড়ার টিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, দাসপাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করেন। দোকানপাটের অধিকাংশও তাঁদের। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ, রাকিব হত্যাকাণ্ড দাসপাড়া বাজার এলাকায় ঘটলেও হত্যাকাণ্ডের পর তারা কেন সাক্ষী দেয়নি-এমন অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়।
ভুক্তভোগী আরিফ হাসান রুবেল নামের এক মুদি দোকানদার বলেন, শুক্রবার দুপুর থেকেই কিছু লোক অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিল। হামলার সময় তিনি দোকানের পাশেই তার বাড়িতেই ছিলেন। হঠাৎ শব্দ শুনতে পান। তারা চলে যাওয়ার পরে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে দেখেন তার দোকানের শাটার ও গেটে হামলা চালানো হয়েছে। এখন নিরাপত্তাহীনতায় আমরা দোকান বন্ধ রেখেছি।
ঘটনাস্থলের পাশে সবিতা রানীর বাড়ির টিনের বেড়ায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা তো কোনো অপরাধ করি নাই। তাহলে আমার বাড়িতে হামলা কেন? কে হামলা করল। কেন দোকানপাটে হামলা করছে। আমরা এর বিচার চাই।
হামলার শিকার আরেক বাড়ির মালিক নমিতা দাস বলেন, তাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে আমরা দেখিনি। তার পক্ষের লোকজন হুমকি দিয়ে বলছিল, এত লোক-গ্রামবাসী থাকলেও কেউ দেখেনি। এদেরকে শেষ করে দেব।
তিনি আরও বলেন, হামলার সময় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ির গেট বন্ধ করে একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। পরে হামলাকারীরা তাদের গেটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ও অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে নিহত রাকিবের পরিবার ও প্রতিবেশীদের দাবি, ঘটনার সময় তারা নগরীর নূরপুর কবরস্থানে মরদেহ দাফন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এ সময় হত্যা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি মাদক কারবারি মমিনের জামাই সিফাত লোকবল নিয়ে এসে হিন্দুবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা চালিয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে বৈরাগীপাড়ায় নিহত যুবদল নেতা রাকিবের বাসায় গিয়ে তার মা নুরজাহান বেগম, বোন রুবিনা বেগম ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা হয়।
এ সময় তার বোন রুবিনা বেগম বলেন, আমার ভাইকে তো কোনো হিন্দু লোক মারেনি, তাহলে তাদের দোকান-বাড়ি ভাঙতে যাব কেন। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। মরদেহ দাফনের পর বাবা-মা অজ্ঞান হয়ে পড়েন, আমরা তাদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। মমিনের জামাই লোকজন এনে কিছু হিন্দু ও মুসলমানদের দোকান ভাঙচুর করেছে, যাতে মামলাটি হালকা করা যায়।
রাকিবের মা নূর জাহান বেগম বলেন, কালকে কে কী করল, না করল, সেগুলো আমাদের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। আমরা তো সন্তানহারা। আমরা তো সন্তানকে মাটি দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত। আমরা কেন যাব হিন্দুদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করতে। হিন্দুদের সঙ্গে আমাদের কী সমস্যা। মমিনের জামাই এটা করেছে, যাতে কেসটা হালকা হয়।
স্থানীয়রা জানান, নিহত রাকিব আগে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মাদক কারবারি মমিনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মমিনের কাছ থেকে সরে আসা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে কয়েক মাস আগে তাদের দ্বন্দ্বের জেরে রাকিবের পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তারা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মমিনের স্ত্রীর সঙ্গে রাকিবের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর পর মমিনের স্ত্রী গিয়ে তাকে ঘটনা জানিয়ে রাকিবকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করেছে বলে এমন অভিযোগও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে করা হয়।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মজিদ আলী বলেন, যাঁরা মার্ডার করেছে, তাঁদের শনাক্ত করা হচ্ছে। যাঁরা ভাঙচুর করেছে, তাঁদেরও আমরা শনাক্ত করেছি। গতকাল রাতের ঘটনাস্থলের সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করা হবে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশকে তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে গেছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সুবিধা নেওয়ার জন্য যাঁরা এটা করেছে, তা তাঁদের নজরে আছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় তিনি আরও বলেন, এ নগরীর অধিবাসী যেকোনো সম্প্রদায়ের হোক না কেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে। একটি ঘটনা ঘটার পর পুলিশ কত দ্রুত রেসপন্স করে, সেটি তাদের দায়িত্বের অংশ। কোথাও গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে রাকিব হাসান হত্যার ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে তাঁর পরিবার। শুক্রবার রাকিবের বাবা আবদুস সামাদ (৪৪) বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় রংপুর নগরের রবার্টসনগঞ্জ তাঁতিপাড়ার মো. মমিন (৪২), তাঁর স্ত্রী সুইটি বেগম (৩৫), লিটন মিয়া (৩০), লিখন মিয়া (২৮), আবদুর খালেক (৩০), আবদুল মজিদ (৩১) ও হাসান আলীকে (৩২) আসামি করা হয়েছে।
আজ দুপুরে মমিনের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় দোকানদারেরা জানান, ঘটনার পর থেকে পুরো পরিবার পলাতক। ফলে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




















