সারাদেশ

সিসার বিষে নীরবে মরছে কাশিয়ানীর সবুজ জনপদ

  শেখ শোভন আহমেদ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:১৭:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ

 

প্রকৃতি মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, ভেঙে আবার গড়তে শেখায়। কিন্তু সেই প্রকৃতির সবুজ বিস্তৃত ভূমি যখন পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, পরিবেশ যখন প্রতিনিয়ত বিষাক্ত সিসা গিলে নেয়—তখনও আমরা নীরব। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি স্বেচ্ছায় চুপ করে আছি, নাকি কৌশলে আমাদের চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে?

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পারুলিয়া এলাকার সোনাডাঙ্গা খালের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে এমএস মেটাল নামে একটি সিসা তৈরির কারখানা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কারখানা পুরো এলাকাকে এক ভয়াবহ বিষাক্ত অঞ্চলে পরিণত করেছে।

কারখানাটিতে পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমে সিসা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া, অ্যাসিডের দুর্গন্ধ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। এর ফলে ফসলি জমি, খাল-বিল, মাছ, গাছপালা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, দিনে ব্যাটারি ভাঙা হলেও রাতে চলে পোড়ানোর কাজ। চিমনি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে পুরো গ্রাম। টিনের ঘরের চাল ও দেয়ালে জমেছে কালো আস্তরণ। বিষাক্ত বর্জ্যে তিন ফসলি জমি হয়ে পড়েছে অনুর্বর। খাল-বিলের পানি এতটাই দূষিত যে মানুষ ও গবাদিপশু গোসল করলেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শরিফুল ইসলাম দুর্জয় নামে এক ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীর নামে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার অনুমোদন নেন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ব্যাটারি পোড়িয়ে সিসা উৎপাদন করা হচ্ছে। অনুমোদনপত্রে আধুনিক পরিশোধন ব্যবস্থার (ATP ও ETP) কথা থাকলেও বাস্তবে এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই।

স্থানীয়রা জানান, কারখানার বিরুদ্ধে কথা বললেই হামলা, মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অনেককে জেল খাটতে হয়েছে, কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দুর্জয়ের বিরুদ্ধে সরকারি খাল দখল ও ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন–এর আওতাধীন কৃষিজমি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব আওলাদ বলেন,“ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামে এই বিষাক্ত সিসা কারখানার কারণে কৃষি, স্বাস্থ্য—সবকিছু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, “একসময় দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা দুর্জয় এখন ভয়ঙ্কর প্রভাবশালী। অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে, কেউ কিছু বললে হুমকি দেয়।”

পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সিসা দূষণ শুধু পরিবেশ বা কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, মাথাব্যথা বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো—সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করছে।

সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি–এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সিসা দূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে অতিরিক্ত সিসা বহন করে বেঁচে আছে, যার অন্যতম উৎস এসব ব্যাটারি ও সিসা কারখানা।

 

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা ভয় না পেয়ে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— শরিফুল ইসলাম দুর্জয়ের খুঁটির জোর কোথায়? পরিবেশ অধিদপ্তর কি না দেখার অদ্ভুত চশমা পরে আছে?
পরিবেশের নামে অনুমোদন পাওয়া এই দানবাকৃতির কারখানার বিরুদ্ধে বাস্তবে কবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ততদিন পর্যন্ত কি কাশিয়ানীর সেই সবুজ জনপদ সিসার বিষেই ধুঁকতে থাকবে?

জনগণের কাছে আজ কোনো উত্তর নেই—আছে শুধু দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আকুতি আর নীরব আহাজারি।

আরও খবর

Sponsered content