প্রতিনিধি ১১ আগস্ট ২০২৬ , ৩:০২:১১ প্রিন্ট সংস্করণ
শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরমধুয়া নামাপাড়া ও চরমধুয়া দড়িপাড়া গ্রামে প্রায় ১৬ বছর ধরে চলছে মৃগী নদীর ভাঙন। দীর্ঘ এই সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকার বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁশঝাড় ও গাছপালা। একমাত্র বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক পরিবার।
চলতি বর্ষায় ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ২৫ জুলাই এক দিনেই চরমধুয়া নামাপাড়ায় অন্তত পাঁচটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক।
নকলা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে মৃগী নদীর দুই তীরে চরমধুয়া গ্রাম। নদীর এক পাশে চরমধুয়া নামাপাড়া, অন্য পাশে চরমধুয়া দড়িপাড়া। নামাপাড়ায় প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাস।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের ভাঙনে গ্রামের অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে পাড়াটিতে চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও। ফলে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নামাপাড়া।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের নদীর তীর ও ফসলি জমির ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া কিংবা অন্যান্য পরিবহনের জন্য এখনও ব্যবহার করতে হয় ঘোড়ার গাড়ি। কোথাও কোথাও ঘোড়ার গাড়ি ঠেলে পার করতে হয়। এ অবস্থায় স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল ভবনও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদী আরও এগিয়ে এলে এসব স্থাপনাও বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়া এলাকায় অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতঘর নদীতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ সময়ে নদীভাঙন রোধে টেকসই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্যও পর্যাপ্ত সহায়তা মেলেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শাফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে চরমধুয়া নামাপাড়ায় নদী ভাঙছে। রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি সব নদীতে চলে যাচ্ছে। দুই পায়ে হেঁটে চলার রাস্তাটিও নেই। সরকার আমাদের দেখে না। আমরা কি এই দেশের বাসিন্দা না?’
কৃষক সায়েল মিয়া বলেন, ‘ঘরবাড়ি সব ভেঙে নদীতে যাইতাছে। চলাচলের রাস্তা নাই। আমরা এখন যাব কই?’
গৃহবধূ খাদিজা বেগম বলেন, ‘আমার প্রায় ৫-৬ কাঠা জমি নদীতে চলে গেছে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বাঁশঝাড় ছিল। আম-কাঁঠাল গাছ ছিল। সব নদীতে চলে গেছে। এখন ঘরটিও যাওয়ার পথে। সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
অপর বাসিন্দা হাসান মিয়া বলেন, প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে এ অবস্থা চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘যাদের জায়গা আছে, তারা অন্যত্র চলে গেছে। আমাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। এখন আমরা কোথায় যাব?’
নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়ায় প্রায় ৩০-৪০টি বসতঘর নদীতে তলিয়ে গেছে। নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অতিদ্রুত এখানে প্রতিরক্ষা কাজ করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কীভাবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা যায়, তা নিয়েও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।’
দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন চরমধুয়ার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক প্রতিরক্ষা কাজের পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা না হলে মৃগী নদীর ভাঙনে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।





















