মো. সাকিব চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:৪৭:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে কয়েক দিন ধরে সন্ধ্যার পর থেকে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকছে আকাশ। তীব্র শীতের কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রমেক) শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত দুই মাসে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অ্যাজমার মতো জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে শিশুদের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এবং বয়স্কদের বয়স ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে। এই দুই বয়সী মানুষ শীতজনিত রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিচালক আরও জানান, এ সময় প্রায় তিন হাজার শিশু এবং দেড় হাজারের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি শীতজনিত রোগ নিয়ে রমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ৪০০-এর বেশি শিশু ও প্রায় ২০০ জন বয়স্ক রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, “ঠান্ডার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শীতজনিত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ ও অ্যাজমায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। আমরা চিকিৎসার পাশাপাশি পরামর্শ দিচ্ছি, শিশু ও বৃদ্ধদের যেন দ্রুত ঘুম পাড়ানো হয় এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠানো হয়।”
রমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. আয়শা খাতুন জানান, গত তিন দিনে শুধু এই ওয়ার্ডেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত ৫৭৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, বাতজ্বর ও আমাশয়সহ নানা শীতজনিত রোগ নিয়ে আউটডোরে চিকিৎসা নিচ্ছে। গুরুতর অবস্থার রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে।
রংপুর নগরীর নবদিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মমিনুর ইসলাম বলেন, “আমার দুই বছরের ছেলে মাহিম ইসলাম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে শনিবার রাত ১০টার দিকে রমেক হাসপাতালে ভর্তি করি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোর ৫টার দিকে সে মারা যায়।”
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, “শীত মৌসুমকে সামনে রেখে আমাদের মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে। এ সময়ে শিশুদের সমস্যা বেশি হয়। তাই শিশুদের গরম কাপড় পরানো এবং ঠান্ডা থেকে দূরে রাখার বিষয়ে অভিভাবকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।”
রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, কয়েকদিন আগে রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া তেঁতুলিয়ায় ১১, সৈয়দপুরে ১১ দশমিক ৮, কুড়িগ্রামে ১১, দিনাজপুরে ১১ দশমিক ৬, নীলফামারীতে ১২, নওগাঁয় ১১ দশমিক ৮, লালমনিরহাটে ১২ এবং গাইবান্ধায় ১২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “হিমালয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুর বিভাগে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়। উত্তরের বরফশীতল বাতাসের কারণে এ অঞ্চলে হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত এ পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।”
শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রংপুরসহ পুরো উত্তরাঞ্চল। তীব্র শীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। নিউমোনিয়া, সর্দিজ্বরসহ নানা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
এদিকে রংপুর জেলায় জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কম্বলসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় মোট দেড় লাখ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
শীতের কারণে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল ও দিনমজুর মানুষ। কাজের অভাবে তারা ঘরেই অলস সময় কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।




















