সারাদেশ

তিস্তার ভয়াল ভাঙনে সুন্দরগঞ্জে শতাধিক পরিবার নিঃস্ব, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ

  সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: ২৫ মে ২০২৬ , ৫:৩০:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ

 

বর্ষার শুরুতেই ভয়াল রূপ ধারণ করেছে তিস্তা নদী। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তীব্র স্রোতের তোড়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের শখের বাজার ও কালির খামার এলাকায় শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতু সড়ক থেকে প্রায় একশ মিটার পূর্বে গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে বসতভিটা, ফলজ গাছপালা, বাঁশঝাড়, ভুট্টাখেত ও শাকসবজির জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে শতাধিক পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনকবলিত এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কেউ ঘরের টিন খুলে সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ বাঁশের বেড়া কেটে অন্যত্র স্থানান্তর করছেন। আবার কেউ গরু-ছাগল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাস এবং নারীদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

ইতোমধ্যে ফজলু মিয়া, আলম মিয়া, হাফিজার রহমান, আশেক আলী, বাবলু মিয়া, মঞ্জু মিয়া, খলিল মিয়া, আকবর আলী এবং বিধবা রহিমা বেগমসহ বহু পরিবার বসতভিটা, কৃষিজমি ও গাছপালা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

ভাঙনের শিকার রহিমা বেগম বলেন,”আগেও একবার নদীভাঙনে সব হারাইছি। পরে আবার কোনোভাবে ঘর তুলছিলাম। এখন সেই ঘরও নদীতে যাইতেছে। আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”

চারবার ভাঙনের শিকার আবুল কালাম বলেন,”অনেক কষ্টে ধার-দেনা করে বাঁধের ওপর ঘর তুলছিলাম। এখন আবার ভাঙন ঘরের কাছে চলে আসছে। পরিবার নিয়ে কোথায় যামু বুঝতেছি না।”

কৃষক আলম মিয়া বলেন,”আমার ভুট্টাখেত আর শাকসবজির জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। এই ফসল বিক্রি করেই সংসার চলত। এখন সামনে কী হবে জানি না।”

ভিটেমাটি হারানো অনেক পরিবার বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ রাস্তার পাশে কিংবা বাঁধের ওপর পলিথিন টানিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। খাবারের সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব ও স্যানিটেশন সমস্যায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম প্রাণসংকটে পড়েন। হঠাৎ নদীতীরের মাটি ধসে পড়লে তিনি পানিতে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর বর্ষায় একই ধরনের ভাঙনে সর্বস্ব হারালেও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। তারা দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা, ডাম্পিং কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন,”ভাঙনকবলিত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন,”ভাঙনপীড়িত মানুষের জন্য দ্রুত ত্রাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুনর্বাসনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এদিকে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান বলেন,”দ্রুত জিও ব্যাগ না ফেললে শত শত ঘরবাড়ি আরও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য স্থায়ী পদক্ষেপ প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তার ভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। স্থায়ী সমাধান ও কার্যকর পুনর্বাসন ছাড়া প্রতি বর্ষাতেই নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তিস্তাপাড়ের মানুষ।

আরও খবর

Sponsered content