প্রতিনিধি ৫ জুন ২০২৬ , ১২:০০:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ
আর মাত্র কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে ৪৮ দলের এই মহাযজ্ঞ ঘিরে আয়োজকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। ফিফার দাবি, টুর্নামেন্টটি তিন আয়োজক দেশের অর্থনীতিতে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে, বৈশ্বিক জিডিপিতে সৃষ্টি করবে ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তৈরি করবে ৮ লাখ ২৪ হাজার কর্মসংস্থান। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের বিশ্লেষণ মতে, বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছে, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি সংযত হতে পারে। বিশেষ করে অতীতের বিশ্বকাপগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, আর টুর্নামেন্ট শেষে বহু অবকাঠামো ‘শ্বেতহস্তী’ বা ব্যয়বহুল অথচ অপ্রয়োজনীয় সম্পদে পরিণত হয়। ফলে বিলিয়ন ডলারের লাভের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে আবার সামনে এসেছে লাভক্ষতির বাস্তব হিসাব এবং ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ বা শ্বেতহস্তী বিতর্ক।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হবে ১১ জুন। প্রথমবারের মতো ১৬টি আয়োজক শহরে ৪৮টি জাতীয় দল অংশ নেবে। এটিই হবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।
ফিফা দাবি করছে, এই বিশ্বকাপ তিন আয়োজক দেশÑ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর জন্য সম্মিলিতভাবে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার (২৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো) অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার (৩৫ বিলিয়ন ইউরো) অতিরিক্ত জিডিপি যোগ হবে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তবে এসব আশাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, টুর্নামেন্ট-পরবর্তী বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফল ফিফার পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত হতে পারে।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, সংস্থা, আয়োজক শহর এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিনিয়োগকারীদের ব্যয়সহ এই বিশ্বকাপ আয়োজনের মোট খরচ হবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার (১২ বিলিয়ন ইউরো)। এর মধ্যে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যয় হবে ১১ বিলিয়ন ডলারের (৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরো) বেশি।
ডেনিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্যাক্সো ব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রচারিত বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধার হিসাব প্রকৃত প্রভাবকে অনেকটাই বাড়িয়ে দেখায়। গড়ে বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস ফিফার হিসাবের তুলনায় কম রাজস্ব সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। দেশটির জন্য সম্ভাব্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো) অর্থনৈতিক সুবিধা জিডিপির ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনীতির জন্য বিশ্বকাপের প্রভাব কার্যত সীমিত প্রবৃদ্ধির উৎস মাত্র।
অন্যদিকে এই ত্রিদেশীয় আয়োজনের সবচেয়ে বড় আপেক্ষিক সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে মেক্সিকোকে। দেশটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা ৩ বিলিয়ন ডলার (২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো), যা ব্যবহৃত অর্থনৈতিক মডেলের ওপর নির্ভর করে জিডিপির ০ দশমিক ২ থেকে ০ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। পর্যটন ও সেবা খাতনির্ভর অর্থনীতিতে দর্শনার্থীদের আগমন সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব ফেলবে।
বিশেষ করে গুয়াদালাহারা, মনতেরে এবং মেক্সিকো সিটির মতো আয়োজক শহরগুলোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
কানাডার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ইউরো)। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সুবিধাকে বড় আকারের সরকারি ব্যয়ের বিপরীতে বিবেচনা করতে হবে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরে গ্রীষ্মকালজুড়ে অবকাশযাপন ও আতিথেয়তা খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। হিউস্টন, নিউইয়র্ক এবং ডালাস হবে প্রধান সুবিধাভোগী শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে গবেষণাটি বলছে, এসব কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুবিধা হবে মূলত অস্থায়ী।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই টুর্নামেন্ট উপলক্ষে প্রায় কোনো নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ম্যাচকেন্দ্রিক পর্যটন মূলত বিদ্যমান পর্যটন প্রবাহের পুনর্বণ্টন ঘটাবে, অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য খুব বেশি সৃষ্টি করবে না।
বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ বা শ্বেতহস্তী সমস্যা।
প্রথমত, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত ব্যয় প্রায়ই প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন্ট ফ্লাইভবিয়ার্গের গবেষণা অনুযায়ী, বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজনগুলো গড়ে নির্ধারিত বাজেটের তুলনায় ১৭২ শতাংশ বেশি ব্যয় করে।
এর প্রধান কারণ হলো, বিশ্বকাপের সময়সূচি পরিবর্তন করা যায় না। অবকাঠামো প্রকল্পে বিলম্ব হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে আয়োজকদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে বাধ্য হতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বিপুল বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে নির্মিত অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশ টুর্নামেন্ট শেষে স্থায়ী অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে না।
বিশেষ করে বহু স্টেডিয়াম ‘শ্বেতহস্তী’তে পরিণত হয়Ñ যেগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু ব্যবহার হয় খুবই কম।
ব্রাজিলে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ এবং কাতারে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এই সমস্যার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। দুটি আসরেই এমন বেশ কয়েকটি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে, যেগুলোর বিশ্বকাপ-পরবর্তী কোনো টেকসই ব্যবহার গড়ে ওঠেনি।
ব্রাজিলের মানাউস শহরের ‘এরিনা দা আমাজোনিয়া’ স্টেডিয়ামকে জনঅর্থের অপচয়ের এক প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার (১৮৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো) ব্যয়ে আয়োজিত কাতার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। দেশটির অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তন এলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভেন্যু আগে থেকেই রয়েছে। এসব স্টেডিয়ামের প্রায় সবই লাভজনক পেশাদার ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে পরিচালিত হয় এবং তাদের নিজস্ব দর্শকভিত্তি রয়েছে।
ফলে এ বছর ‘শ্বেতহস্তী’ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে তা সত্ত্বেও আয়োজকদের ব্যয় প্রাথমিক হিসাব ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখন দর্শক চাহিদা নিয়ে। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরের ২০০টির বেশি হোটেলের প্রায় ৮০ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের বুকিং প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে কম।
হোটেলগুলোর মতে, বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়ার জটিলতা, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং টিকিট ও ভ্রমণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমনকি কিছু হোটেল এই বিশ্বকাপকে ‘নন-ইভেন্ট’ বলেও বর্ণনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী হলেও জিডিপিতে প্রকৃত প্রভাবের হিসাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রাথমিক পূর্বাভাস ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে প্রায়ই বড় পার্থক্য দেখা যায়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও তা সাধারণত স্বল্পমেয়াদি, নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক এবং ‘সাবস্টিটিউশন’ ও ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাবে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় বা হস্তক্ষেপ বাড়লে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় কমে যেতে
পারে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিতই থেকে যায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ অর্থনীতির ক্ষেত্রে।
ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরটি মাঠের লড়াইয়ে যতটা জাঁকজমকপূর্ণ, জাতীয় অর্থনীতির খাতায় তার প্রভাব ততটা বিস্ময়কর নাও হতে পারে।




















