হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : ১৪ জুন ২০২৬ , ৫:৩৫:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের কালিতলা বাজারে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরীকে আটকে রেখে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মূল পরিকল্পনাকারী ও ভুক্তভোগীর কথিত বন্ধুসহ তিন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ঠাকুরগাঁও সদর থানা পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- কালিতলা বাজার এলাকার আনারুলের ছেলে তামিম ইসলাম (২২), মিন্টুর ছেলে রনি (২১) এবং রহমান মাজেদুরের ছেলে মাসুদ (২২)। বর্তমানে ওই কিশোরী ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার (১৩ জুন) দিবাগত রাতে ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহান আলীর নির্দেশনায় একটি বিশেষ টহল দল কালিতলা বাজার এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিল। ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে মামলার দ্বিতীয় আসামি রনির বাবা মিন্টুর পরিত্যক্ত গোডাউন ঘরের সামনে একটি মোটরসাইকেলের সন্দেহজনক চলাচল পুলিশের নজরে আসে। মোটরসাইকেলটি দ্রুত ওই গোডাউন থেকে বের হয়ে আবার সেখানে ফিরে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ দল ওই গোডাউন ঘরে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে ভিকটিম কিশোরীকে উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকেই অভিযুক্ত তিন আসামিকে পালানোর সময় ধাওয়া করে আটক করে পুলিশ। পরে দ্রুত কিশোরীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পারিবার ও চিকিৎসাধীন কিশোরীর বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে সে তার এক বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। পরবর্তীতে রাত গভীর হলে সে ফোনে পরিবারকে জানায় যে, অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় সে ওই বান্ধবীর বাসাতেই থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে সপ্তাহখানেক আগে সেই বান্ধবীর মাধ্যমেই ১ নম্বর অভিযুক্ত তামিমের সাথে কিশোরীটির পরিচয় হয়েছিল। সেই সুবাদে তামিম তাকে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে কৌশলে তাকে কালিতলা বাজারের ওই নির্জন গোডাউন ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানে তামিম তার অন্য দুই বন্ধু রনি ও মাসুদকে ডেকে এনে তিনজন মিলে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মেয়ের অবস্থা দেখে হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা।
হাসপাতালের বাইরে অশ্রুসিক্ত চোখে ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। মেয়েটা বান্ধবীর জন্মদিনের কথা বলে গেল, আর সকালে খবর পাইলাম আমার কলিজার টুকরা হাসপাতালে। পশুরা আমার মেয়ের জীবনটা শেষ করে দিল। আমি পুলিশ প্রশাসন ও মাননীয় আদালতের কাছে হাত জোড় করে আকুতি জানাচ্ছি, আমার মেয়ের ওপর যারা এই বর্বর অত্যাচার চালিয়েছে, তাদের যেন ফাঁসি দেওয়া হয়।
মেয়ের শিয়রে বসে বিলাপ করতে করতে মা বলেন, তামিম নামের ওই ছেলেটা আমার সরল মেয়েটাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে। আমার মেয়ে তো কোনো অপরাধ করেনি, তবে কেন তার সাথে এমন পৈশাচিক আচরণ করা হলো? আমি এই নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠিন শাস্তি চাই।
কালিতলা বাজার ও জগন্নাথপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কালিতলা বাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, মিন্টুর এই গোডাউন ঘরটি রাতের বেলা প্রায়ই ফাঁকা থাকে। লম্পটরা এই সুযোগটাই নিয়েছে।
আমাদের এলাকায় এমন জঘন্য ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। এই ঘটনার পর আমরা আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং ধর্ষকদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ছালমা বেগম বলেন, বন্ধুত্বের নামে ডেকে এনে এভাবে একটা বাচ্চার জীবন ধ্বংস করে দেওয়া মেনে নেয়া যায়না। দ্রুত তাদের শাস্তি না দিলে আমরা এলাকাবাসী রাজপথে নামতে বাধ্য হব।
এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহান আলী বলেন, আমাদের টহল পুলিশের তৎপরতার কারণেই মেয়েটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকেই মূল তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনায় মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।




















