প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৬ , ২:২২:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
যুদ্ধবিরতির কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তেহরান ওই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি করেছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) শনিবার জানিয়েছে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার পরই তারা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থান লক্ষ্য করে সর্বশেষ হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্য, এটি ছিল ‘ইরানি বাহিনীর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর অযৌক্তিক আগ্রাসনের জবাব’, যা তাদের মতে ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন’।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী সিরিকের তাহেরুই ঘাটে শুক্রবার গভীর রাতে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একজন সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়, এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল আঘাত হানার ফলেই ওই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে বিস্ফোরণের পর মেহর নিউজ এজেন্সি জানায়, সিরিক বন্দর স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর যন্ত্রপাতি বা স্থাপনায় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সেন্টকম এই সামরিক অভিযানকে ‘হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার শক্তিশালী জবাব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘স্পষ্টতই এটি আমাদের যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন।’
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরান যদি আরও কোনো হামলা চালায়, তবে সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।’
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
শনিবার সকালে, ইরানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘যদি এই আগ্রাসন আবারও ঘটে, তাহলে আমাদের জবাব এবারকার চেয়েও আরও ব্যাপক হবে।’
নাজুক যুদ্ধবিরতি
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। চুক্তিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল যুদ্ধবিরতি। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়; বরং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও ওই আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল।
এর আগে ইরান সতর্ক করে বলেছিল, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ যেন হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের না হয়। তবে এরপরও অনেক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে কয়েকটি জাহাজ তেহরানের অনুমোদনহীন বিকল্প পথ ব্যবহার করেছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে এমন আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক জাহাজ এভার লাভলিতে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। এদিকে, সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের লেবাননে বোমাবর্ষণও পুরো চুক্তিটিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবানন একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ বা কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই চুক্তির লক্ষ্য ‘অবিরাম সংঘাতের চক্রের অবসান ঘটানো।’
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হলে সেখানে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনও দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধের বিষয়। তেহরান ও ওয়াশিংটন এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা আবার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবেন কি না, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
শুক্রবার গ্রোসি বলেন, ‘ইরান সরকার খুব স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেছে যে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু শুধু ইচ্ছার কথা বলাই যথেষ্ট নয়। আমাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করা উচিত।’
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে কম সমৃদ্ধ (ডাউনব্লেন্ড) করা হবে।














