প্রতিনিধি ১৬ জুলাই ২০২৬ , ১১:১৭:০৩ প্রিন্ট সংস্করণ
সফর মাসকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত অনেক ধারণা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক মানুষ এই মাসকে অশুভ মনে করেন এবং বিভিন্ন কাজ থেকে বিরত থাকেন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো মাস, দিন বা সময় নিজস্বভাবে অমঙ্গলজনক নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো মাসই অশুভ নয়, রোগের সংক্রমণ নিজে থেকে হয় না এবং পেঁচাকে অশুভ মনে করা যাবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭০৭)
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা এবং কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। সময় বা মাসকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং নেক আমলে নিজেকে নিয়োজিত করা।
সফর মাসে বিপদ-আপদ বেশি আসে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অনেকের মধ্যে এই বিশ্বাস রয়েছে যে, এই মাসে দুর্ভাগ্য বা অমঙ্গল বেশি ঘটে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না।’ (সুরা তাগাবুন: ১১) তাই কোনো নির্দিষ্ট মাসকে অশুভ মনে করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে যায় না।
সফর মাসে বিয়ে-শাদি করা যাবে না এমন ধারণাও সমাজে প্রচলিত একটি কুসংস্কার। ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই যে, কোনো নির্দিষ্ট মাসে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। বরং শরিয়তের নিয়ম মেনে বছরের যেকোনো সময় বিয়ে করা বৈধ।
অনেকে সফর মাসে বিশেষ তাবিজ-কবজ ব্যবহার করেন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস সঠিক নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে নিরাপত্তা বা সাহায্যের এমন বিশ্বাস থেকে মুসলমানদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সফর মাসের শেষ বুধবারকে ঘিরে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ পালনের বিষয়টিও সমাজে প্রচলিত। তবে ইসলামের মূল উৎস কোরআন ও সহিহ হাদিসে এই দিনকে বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালনের স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এভাবে পালন করার প্রচলন ছিল না।
তবে সফর মাসসহ বছরের যেকোনো সময় মুসলমানরা বিভিন্ন নেক আমল করতে পারেন। নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া, দান-সদকা এবং নফল ইবাদত একজন মুমিনের জন্য কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা (আইয়ামে বিজ), সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখা এসব আমল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামের ইতিহাসেও সফর মাসের রয়েছে বিশেষ কিছু ঘটনা। হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (স.) মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এই মাসে। দ্বিতীয় হিজরিতে আবওয়া অভিযান, সপ্তম হিজরিতে খায়বর বিজয় এবং সাহাবিদের মধ্যে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ও আমর ইবনে আস (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও সফর মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ছাড়া দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয় বলেও ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সফর মাস কোনো অশুভ সময় নয়; বরং ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস।
মূলত ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। সময় বা মাস নয়, মানুষের আমল ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই মূল বিষয়। তাই সফর মাসকে ভয় বা অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।















