মো. সাকিব চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার ১৫ জুন ২০২৬ , ৩:৪১:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ
জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃত, স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হাঁড়িভাঙা আম সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক কারণে এবার ফলন কিছুটা কম হলেও আমের বাজারে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করছে কৃষি বিভাগ ও চাষিরা।
রংপুর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের আবাদ হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) দুপুর ২টায় রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা আম বাজারজাতকরণের উদ্বোধন করা হবে।
তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই রংপুরের বিভিন্ন বাজারে হাঁড়িভাঙা আমের বেচাকেনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে কাঁচা হাঁড়িভাঙা আম পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং পাকা আম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলন কম হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দাম পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান বাজার পদাগঞ্জ হাটের অবকাঠামোগত দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও চাষিরা। হাটের আশপাশের সড়কগুলো কর্দমাক্ত হওয়ায় পরিবহনে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না অনেক চাষির।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পরিপক্ব ও উন্নত মানের হাঁড়িভাঙা আম বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাবে। এর আগে বাজারে ওঠা অনেক আম অপরিপক্ব হতে পারে। প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে কিছুটা সময় অপেক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষমুক্ত, আঁশবিহীন ও অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ায় হাঁড়িভাঙা আমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এই আমের চাষ হচ্ছে। এর ফলে হাজারো কৃষক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। আমের মৌসুমকে ঘিরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়।
চাষিদের অভিযোগ, জিআই স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও হাঁড়িভাঙা আমের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এখনো পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে আমের সংরক্ষণকাল বাড়াতে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান গবেষণার অগ্রগতি নিয়েও তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ৭০ বছর আগে নীলফামারীর ডিমলার রাজা তাজবাহাদুর সিংহের বাগান থেকে একটি কলম চারা এনে মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার রোপণ করেছিলেন। সেই গাছ থেকেই উৎপত্তি হয় আজকের জনপ্রিয় হাঁড়িভাঙা আমের।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার রংপুর জেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এর মধ্যে ২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন আম উৎপাদন হয়।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “জিআই পণ্যখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ আজ থেকে শুরু হচ্ছে। ফলন কিছুটা কম হলেও কৃষকরা এবার ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “হাটের অবকাঠামো, সড়ক, ব্যাংকিং সুবিধা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করারও চেষ্টা করা হচ্ছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে কিছু আম ঝরে পড়লেও ফলন ভালো হয়েছে এবং আমের আকারও বড় হয়েছে। ফলে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। এবার হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি থেকে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল হাঁড়িভাঙা আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে।




















