প্রতিনিধি ৪ নভেম্বর ২০২৫ , ৪:৪৮:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অত্যন্ত সুন্দর অবয়বে সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে সঞ্চার করেছেন রুহ বা আত্মা। একজন মানুষের পরিপূর্ণ মানবসত্তা হলো তার দেহ ও আত্মার সমন্বয়। সচরাচর যদিও আমরা মানুষের দৈহিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হই, প্রকৃতপক্ষে আত্মাবিহীন এই দেহের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই। একজন মানুষের যতটুকু মূল্য, তা নির্ভর করে এই আত্মার ওপর। যেমন, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘আর আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পচা কর্দম থেকে তৈরি বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্ট একটি মানবজাতির পত্তন করব। অতঃপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নেব এবং তাতে আমার রুহ থেকে ফুঁক দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেয়ো।’ (সুরা হিজর : ২৮-২৯)
আমাদের শরীর আত্মাবিহীন কতটা মূল্যহীন ও পরিত্যাজ্য, তা বোঝা যায় যখন একজন মানুষের মৃত্যু হয়। শরীর থেকে যখন আত্মা চলে যায় তখন ওই মানুষটির সব পার্থিব সম্পদের মালিকানা স্বত্বও সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়। প্রশ্ন হলো, যে আত্মার কারণে আমরা সৃষ্টির সেরা জীব, সেই আত্মার পরিচর্যা আমরা কতটুকু করি? অথচ এই আত্মার সুস্থতার ওপরই নির্ভর করে আমাদের সব সুস্থতা ও সফলতা। হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রেখো, ওই গোশতের টুকরাটি হলো- কলব।’ (সহিহ বোখারি)
বর্ণিত হাদিস থেকে বোঝা যায় আত্মার পবিত্রতার প্রয়োজনীয়তা। অথচ নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন, আধ্যাত্মিকতার প্রতি উদাসীনতা, জীবনাচরণের জীর্ণতা ইত্যাদি কারণে মন-মননে কুপ্রবৃত্তির ফলে আমাদের অন্তরাত্মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শারীরিক রোগ-ব্যাধির চেয়েও আত্মার রোগে মানুষ বহুলাংশে আক্রান্ত। যদিও তা বুঝতে পারি না এবং বোঝার চেষ্টা করি না। শারীরিক রোগ ব্যক্তির ক্ষতি, মানুষের জীবন নাশ করে, কিন্তু অন্তরের ব্যাধি ধ্বংস করে দেয় ব্যক্তি থেকে পরিবার, এমনকি পুরো সমাজ। কেননা আত্মার ব্যাধি নৈতিক জীবনকে সত্য-সুন্দরের পথ থেকে বিচ্যুত করে আর মিথ্যা-কলুষতার দিকে ধাবিত করে।
শারীরিক রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসালয়, চিকিৎসক এবং বহুবিধ ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে আমরা বড়ই উদাসীন। এ রোগ থেকে আরোগ্যের চিকিৎসা কোথায়, কীভাবে করা যায় সে ব্যাপারে মানুষের প্রচেষ্টা শূন্যের কোঠায়। এ ব্যাপারে মানুষকে তেমন কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহন করতে দেখা যায় না; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ উদাসীনতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজ।
সুদ, ঘুষ, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি আর নিজেদের ভোগলিপ্সা পূরণের জন্য হারাম পথে দৌড়াতে গিয়ে মানুষের অন্তরাত্মা কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে গেছে। মনমানসিকতায় অনৈতিকতার মরীচিকা ধরেছে। শয়তান আমাদের গর্হিত কাজগুলোকে মোহনীয় ও আকর্ষণীয় করে দেখায়, ফলে আমরা কাজগুলোকে সৎ ও সুন্দর বলে ধরে নিই এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকি- যা সুরা আল ফাতিরের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর করে বর্ণিত হয়েছে।
এমতাবস্থায় দরকার অন্তরের আয়নাকে পরিষ্কার করা, ইমানের আলোয় আলোকিত হওয়া এবং চলার পথকে আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সুবাসে সুশোভিত করা। এ জন্য আমাদের উপযুক্ত পরামর্শকের শরণাপন্ন হতে হবে, যার সান্নিধ্যে মন্দপ্রবণ মনমানসিকতা দূর হবে। তার পরামর্শ হবে কোরআন-হাদিসভিত্তিক। যে পথে চলেছেন অতীত যুগের আউলিয়ায়ে কেরাম ও আধ্যাত্মিক সাধকরা, যে পথ ও মতে চললে আমাদের কল্পনাজগতে আসবে স্বচ্ছতা, ভাবনায় আসবে পবিত্রতা, চিন্তায় আসবে পরিপক্বতা, ভাষায় আসবে মাধুর্য এবং বর্ণনায় আসবে গ্রহণযোগ্যতা। মন-মস্তিষ্কে শুরু হবে নবজাগরণ, আলোকিত হবে আত্মবিশ্বাস। ঠিকরে বেরোবে ব্যক্তিত্বের বিচ্ছুরণ।
এমন আলোকিত মানুষের সান্নিধ্য ও পরামর্শে একনিষ্ঠভাবে সাধনা করে গেলে আশা করা যায়- আমাদের অন্তরের সব ময়লা দূর হবে, আমরা খুঁজে পাব মানুষ হয়ে এ জগতে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করার সার্থকতা এবং পৌঁছে যাব প্রশান্তিময় এক অবিনশ্বর জগতে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।
মুহাম্মদ সালমান শফী : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট জামে মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা















