আন্তর্জাতিক

ওয়ার্নার ব্রাদার্স কিনে নিল প্যারামাউন্ট

  প্রতিনিধি ৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১:১৩:১২ প্রিন্ট সংস্করণ

হলিউডে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে ১১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স। দুই বৃহৎ মার্কিন স্টুডিও একীভূত হওয়ার এই চুক্তিতে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও স্ট্রিমিং শিল্পের চিত্র বদলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

কয়েক মাসের আইনি লড়াই, প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য কর্মী ছাঁটাই নিয়ে সমালোচনার পর অবশেষে চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। এর ফলে এইচবিও, সিবিএস, নিকেলোডিয়ন, শোটাইম, কমেডি সেন্ট্রাল, ডিসি স্টুডিওস ও ফুড নেটওয়ার্কের মতো বড় ব্র্যান্ড একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে এসেছে।

নতুন প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হবে ‘স্কাইড্যান্স করপোরেশন’। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ডেভিড এলিসন বলেন, এই চুক্তি চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক’ মুহূর্ত।

তিনি বলেন, দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিভা, সম্পদ ও বৈশ্বিক পরিসরকে একত্র করে চলচ্চিত্র ও বিনোদন শিল্পে আরও শক্তিশালী প্রতিযোগী তৈরি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

অধিগ্রহণের ফলে প্যারামাউন্টের মালিকানায় আসবে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘হ্যারি পটার’, ‘গেম অব থ্রোনস’ ও ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’। এর সঙ্গে প্যারামাউন্টের বিদ্যমান ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’, ‘মিশন: ইমপসিবল’ ও ‘শ্রেক’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজও যুক্ত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার পর একে ‘দারুণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অসাধারণ এবং এটি একটি বড় কোম্পানিতে পরিণত হবে।

চুক্তির পর প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। সাবেক ম্যাটেল প্রধান নির্বাহী ইয়োন ক্রেইজকে সহ-প্রধান নির্বাহী করা হয়েছে। তিনি দৈনন্দিন কার্যক্রম ও দুই প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণের দায়িত্ব দেখবেন। অন্যদিকে এলিসন কৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে মনোযোগ দেবেন।

সিএনএনের চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে বিবিসির সাবেক মহাপরিচালক মার্ক থম্পসন দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। সিবিএস নিউজের প্রধান সম্পাদক থাকছেন বারি ওয়েইস। এইচবিও ও ম্যাক্সের কনটেন্ট বিভাগের প্রধান ক্যাসি ব্লয়েস নতুন প্রতিষ্ঠানের সরাসরি গ্রাহকভিত্তিক কনটেন্ট বিভাগের সহ-সভাপতি ও প্রধান কনটেন্ট কর্মকর্তা হবেন।

তবে বিশ্লেষকেরা নতুন প্রতিষ্ঠানের ঋণের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফোরেস্টার রিসার্চের গবেষণা পরিচালক মাইক প্রুলক্স বলেন, এইচবিওর নেতৃত্বই এখন সম্মিলিত স্ট্রিমিং কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ব্যয় কমানোর চাপের কারণে ভবিষ্যতে কনটেন্টের মান প্রভাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এজে বেলের বাজারবিষয়ক প্রধান ড্যান কোটসওয়ার্থও বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। সুদের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ঋণকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনতে খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে হবে।

চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার আগে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিতর্ক চলেছে। শুরুতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির একটি অংশ কেনার জন্য নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। পরে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স প্রতিযোগিতায় নামলে দুই পক্ষের মধ্যে অধিগ্রহণের লড়াই শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্স প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক ডজন অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা চুক্তি ঠেকাতে মামলা করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এই একীভূতকরণ প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেবে, ভোক্তাদের খরচ বাড়াবে এবং সিনেমা হল, কেবল পরিবেশক ও দর্শকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে। পরে অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে প্যারামাউন্টের সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তির পথ পরিষ্কার হয়।

চুক্তির অংশ হিসেবে সিএনএন ও সিবিএসের সংবাদকক্ষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি ‘নিউজ এডিটোরিয়াল ইন্ডিপেনডেন্স বোর্ড’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্যারামাউন্ট। বোর্ডটির লক্ষ্য হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের নিশ্চয়তা দেওয়া।

এ ছাড়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্যারামাউন্টকে প্রতি বছর অন্তত ৩০টি চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে হবে। কম বাজেটের বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কনটেন্ট ব্যবহার করে এই কোটা পূরণের সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। কোটা পূরণে ব্যর্থ হলে মিরাম্যাক্সে প্যারামাউন্টের ৪৯ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করতে হতে পারে।

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র নির্মাণ বাড়ানোর শর্তও রাখা হয়েছে। প্রথম দুই বছর মোট চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্তত ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে করতে হবে। পরবর্তী তিন বছরে এই হার ৩০ শতাংশের বেশি করতে হবে।

ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ১০৩ বছরের ইতিহাসে শতাধিক অস্কার রয়েছে। অন্যদিকে ১৯১২ সালে যাত্রা শুরু করা প্যারামাউন্টও ‘দ্য গডফাদার’ ও ‘টাইটানিক’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শতাধিক অস্কার অর্জন করেছে। নতুন এই একীভূতকরণের ফলে দুই স্টুডিওর বিশাল চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সম্পদ এখন একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে এলো।

আরও খবর

Sponsered content