ধর্ম

জীবনে সময়ের বরকত আনতে মেনে চলুন এই ৯টি ইসলামী শিক্ষা

  প্রতিনিধি ৫ আগস্ট ২০২৬ , ২:৪৭:২০ প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো সময়। হারানো অর্থ বা সম্পদ হয়তো আবার ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু একবার চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও আর ফিরে আসে না। তাই ইসলামে সময়কে আল্লাহ তাআলার মহান নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি সময়ের যথাযথ ব্যবহার করতে পারে, সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেই সফল হওয়ার সুযোগ পায়। আর যে সময়কে অবহেলা করে, সে প্রকৃত অর্থেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

তাই সময় ও সুযোগ থাকা অবস্থাতেই তা কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে মূল্য দাও বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্বাস্থ্য, দারিদ্র্যের আগে সম্পদ, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে জীবন।’ (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস : ৭৮৪৬)

বরকত বলতে কী বোঝায়?

ইসলামে ‘বরকত’ বলতে বোঝায় এমন কল্যাণ, যা কোনো জিনিসের উপকারিতা, স্থায়িত্ব ও ফলপ্রসূতা বৃদ্ধি করে। অর্থ, সময় বা জীবনে বরকত থাকলে অল্প সম্পদ বা সীমিত সময় দিয়েও অনেক ভালো কাজ করা সম্ভব হয়। তাই সময়ে বরকত পাওয়া একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন মনে হয় সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে?

কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ের একটি আলামত হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সময় দ্রুত অতিক্রম হবে, জ্ঞান কমে যাবে, ভূমিকম্প ও ফিতনা বৃদ্ধি পাবে এবং হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)

আরেক হাদিসে এসেছে, এমন সময় আসবে যখন একটি বছর এক মাসের মতো, একটি মাস এক সপ্তাহের মতো এবং একটি দিন এক ঘণ্টার মতো মনে হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩২)

আলেমদের মতে, এর একটি ব্যাখ্যা হলো সময়ের বরকত কমে যাওয়া। অর্থাৎ দিনের দৈর্ঘ্য একই থাকলেও মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার মতো সময় খুঁজে পায় না।

সময়ে বরকত পাওয়ার ৯টি উপায়

১. সময়ের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করুন

সময়ই মানুষের আসল পুঁজি। এই সময়ের মাধ্যমেই ইবাদত, জ্ঞানার্জন, উপার্জন এবং নেক আমল করা সম্ভব। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে দেখা উচিত।

২. দিনের শুরু করুন ভোরে

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য সকালবেলার কাজে বরকত দান করুন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২১২)

ফজরের পর ইবাদত, পড়াশোনা বা কাজ শুরু করলে দিনটি অধিক ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৩. সময়ের হিসাব দিতে হবে এ কথা মনে রাখুন

কিয়ামতের দিন মানুষের জীবন কীভাবে কাটিয়েছে, জ্ঞান কোথায় কাজে লাগিয়েছে, সম্পদ কীভাবে অর্জন ও ব্যয় করেছে এবং শরীর কোন কাজে ব্যবহার করেছে এসব বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)

এই বিশ্বাস সময়ের সঠিক ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করে।

৪. কোরআনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখুন

মহান আল্লাহ কোরআনকে ‘বরকতময় কিতাব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সুরা সাদ, আয়াত : ২৯)

নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা মানুষের জীবন ও কাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৫. সময় নষ্টকারী অভ্যাস বর্জন করুন

উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, দীর্ঘ সময় গেম খেলা, অলসতা কিংবা কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস এসব ধীরে ধীরে সময়ের বরকত কমিয়ে দেয়। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘সময় নষ্ট করা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ; কারণ মৃত্যু মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আর সময়ের অপচয় মানুষকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।’

৬. অল্প সময়কেও মূল্য দিন

সালাফে সালেহিন অবসর সময় নষ্ট করতেন না। তারা সামান্য সময় পেলেই কোরআন তিলাওয়াত, জিকির অথবা জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত থাকতেন। অল্প সময়েরও সঠিক ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

৭. নামাজকে কেন্দ্র করে দৈনন্দিন রুটিন সাজান

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলিমকে সময়নিষ্ঠ হতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের জন্য নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০৩)

নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে দিনের পরিকল্পনা করলে সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।

৮. গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দিন

ইসলামে ‘ফিকহুল আওলাউইয়্যাত’ বা অগ্রাধিকারের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোন কাজ আগে এবং কোনটি পরে করা উচিত, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা। এতে সময়ের অপচয় কমে এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

৯. অল্প সময়ে বেশি নেকির আমল করুন

অল্প সময়েও এমন অনেক আমল রয়েছে, যার সওয়াব অনেক বেশি। যেমন, ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করা, কোরআন তিলাওয়াত, সুরা ইখলাস পাঠ কিংবা ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পড়া। এসব ছোট ছোট আমল মানুষের সময়কে বরকতময় করে এবং আখিরাতের পুঁজি বৃদ্ধি করে।

সময় এমন একটি সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। তাই প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা এবং প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। সময়ের সঠিক ব্যবহার শুধু দুনিয়ার সফলতাই নয়, আখিরাতের মুক্তির পথও সুগম করতে পারে।

আরও খবর

Sponsered content