প্রতিনিধি ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:২২:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ( ডাকসু) নেতারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) চাঁদাবাজির অভিযোগ আনে। পরে রোববার (২৫ জানুয়ারি) ডাকসু নেতারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করেছে বলে প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ করে ঢাবি ছাত্রদল। এ ঘটনায় চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
অন্যদিকে, রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলনে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির তথ্য প্রমাণ তুলে ধরার চেষ্টা করেন ডাকসুর নেতারা।
এর আগে শনিবার মধ্যরাতে একটি ভিডিও সামনে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রদলের একজন কর্মী সাইদ হাসান সাদ একটি ভ্যানে ভাঙচুর করেন ও পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে সাইদ ঘটনাটি আরও দেড় মাস আগের বলে জানান।
তিনি জানান, চাঁদাবাজির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, বরং ডাকসু নেতা সর্বমিত্র চাকমার বিরুদ্ধেই তিনি একটি নতুন সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ তুলেন। নির্বাচনের আগে এই ভিডিওটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উত্থাপিত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রজেক্টরে যা দেখালো ডাকসু:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে কয়েকটি ভিডিও প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রকাশ করে ডাকসু। ভিডিওতে কিছু স্ক্রিনশট দেখানো হয় এবং দোকানদারের সঙ্গে সর্বমিত্র চাকমার কথোপকথনের কিছু ভিডিও তুলে ধরা হয় যেখানে দোকানদার কিছু অভিযোগ করেন। দোকানদার সূর্যসেন হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল কাউসারের বিষয়ে অভিযোগ তুলে জানান, মাঝেমধ্যে তিনি বিল কম দিতেন ও চাপের মুখে তিন হাজার টাকার কাচ্চি খাওয়ান ওদের গ্রুপকে। ভিডিওতে দেখা যায়, দোকানদার সরাসরি কাউসারকে ফোন দিয়ে টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানালে কাউসার এতে সম্মতি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, কার্যনির্বাহী সদস্য শাহিনুর রহমান, সর্ব মিত্র চাকমা প্রমুখ।
প্রতিবাদে ছাত্রদলের লিখিত অভিযোগ, প্রশাসনের তদন্ত কমিটি
ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ভাসমান দোকান থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়িত বলে দাবি করা ডাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেয় সংগঠনটি। রোববার বেলা সাড়ে এগারটায় ঢাবি ছাত্রদলের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মিরাজ কোবাদ চৌধুরী (সহকারী প্রক্টর)। সদস্যরা হলেন- ড. এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী (সহকারী প্রক্টর), অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া (সহকারী প্রক্টর) এবং ফাতেমা বিনতে মুস্তফা (এস্টেট ম্যানেজার, ভারপ্রাপ্ত) যিনি সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিকে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের স্বাক্ষর করা আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, ‘ বিগত সেপ্টেম্বর মাসে বিতর্কিত ডাকসু নির্বাচনের পর থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠা অসংখ্য ক্ষুদ্র ও ভাসমান দোকানকে কেন্দ্র করে অনলাইন ও অফলাইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীগণের পক্ষ থেকে কতিপয় বিতর্কিত ডাকসু প্রতিনিধি কর্তৃক প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা/কর্মচারির যোগসাজশে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট সৃষ্টি করা এবং উক্ত সিন্ডিকেটের বাইরের সব দোকানকে ভাঙচুর ও উচ্ছেদের একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত হয়েছে। যা সামনে আসলে তার বিপরীতে এসকল ডাকসু প্রতিনিধিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে জড়িয়ে চাঁদাবাজির ভুয়া অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাসে সহিংস মব তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে।
অভিযোগ পত্রে বলা হয়, ‘৫ আগস্টের পর থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নেতাকর্মীর নামে এধরনের কোনো অভিযোগ আনার নৈতিক অবস্থান না থাকলেও গত রাতে প্রায় দেড় মাস পূর্বে গৃহিত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের একটি ভিডিওকে কাটছাট করে অনলাইনে ছড়িয়ে এরকম ঘৃণ্য অপবাদ দিয়ে মব সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ক্যাম্পাসের শান্তি-শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।’
অভিযোগসমূহের প্রেক্ষিতে দুটি দাবি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য জানানো হয়।১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দোকানপাট পরিচালনার নিয়ম-নীতির বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা প্রদান করতে হবে ও তা যথাযথভাবে প্রচার করার ব্যবস্থা নিতে হবে; এবং ২. উত্থাপিত অভিযোগ অনুসারে চাঁদাবাজি এবং দোকান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের সিন্ডিকেট সৃষ্টির সঙ্গে বিতর্কিত ডাকসু প্রতিনিধিগণ কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারী যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই দাবিসমূহের প্রেক্ষিতে রোববার রাত ৮টার মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবিসমূহ বাস্তবায়ন না করলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত ডাকসু প্রতিনিধিগণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়।
অভিযোগ দাখিলের পর সংবাদ সম্মেলনে ঢাবি ছাত্রদলের সেক্রেটারি নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘দুই মাস আগের একটি ভিডিওর ঘটনাকে সামনে এনে পরিকল্পিতভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগকে কেন্দ্র করে যে উৎসবমুখর পরিবেশ ও গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, সেটিকে বিতর্কিত করতেই পুরোনো ঘটনাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, আজকের মধ্যেই তদন্ত সাপেক্ষে চাঁদাবাজির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা প্রকাশ করতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ছাত্রদলের কোনো নেতা বা কর্মী জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ালে ভবিষ্যতে নীরব থাকা হবে না এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মধ্যরাতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ
ছাত্রদলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে শনিবার মধ্যরাতে বিক্ষোভ করে ডাকসুর কয়েকজন নেতাসহ একদল শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ভাসমান দোকান থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতাদের চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভ করেন তারা। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত দেড়টার দিকে ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা ও আরেকদল শিক্ষার্থী ডাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে রাজু ভাস্কর্যের সামনে পাল্টা বিক্ষোভ করেন।




















