প্রতিনিধি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১:২৪:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের নৈতিকতা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের ভূমিকা কমে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই সামরিক ও নজরদারি কার্যক্রমে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে ইসরায়েল এমন অভিযোগ উঠেছে। গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, গাজায় সামরিক লক্ষ্য শনাক্ত করার পাশাপাশি দখলকৃত পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের জমি ও স্থাপনা নজরদারি এবং উচ্ছেদের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম পালডিজিটালের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের তৈরি ‘ইমিসাইট’ নামের একটি প্রযুক্তি এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্যাটেলাইট ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে বিশাল এলাকার পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে এই প্রযুক্তি। পরে অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে সেগুলো উচ্ছেদের জন্য এই তথ্য ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করেছেন অধিকারকর্মীরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমিসাইটের ব্যবহার প্রথমে ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইন ফিলিস্তিনিদের এলাকায় শুরু হয়েছিল। সেখানে সরকারের স্বীকৃতিহীন অনেক গ্রাম রয়েছে এবং বাসিন্দাদের জন্য নির্মাণ অনুমোদন পাওয়া কঠিন। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ওই জনগোষ্ঠীকে নিজ এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য উদ্ধৃত করে পালডিজিটাল জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইমিসাইটের মাধ্যমে নেগেভ অঞ্চলের ১০ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ২ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বেদুইনকে উচ্ছেদের ঘটনা যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন একই ধরনের প্রযুক্তি পশ্চিম তীরেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ অনুমোদনসংক্রান্ত অভিযোগ দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ ও পূর্ব জেরুজালেমে এ ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনা বেশি বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন পিস নাউ এটিকে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত করার দিকে একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটির দাবি, ওই ইউনিট ভূমিতে অননুমোদিত স্থাপনা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
স্যাটেলাইটেই হচ্ছে ছবি বিশ্লেষণ
শুধু এআই প্ল্যাটফর্ম নয়, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উন্নতিও নজরদারি কার্যক্রমকে দ্রুত করেছে। ফিলিস্তিনি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ খালেদ সাফির মতে, আধুনিক স্যাটেলাইটে শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ ও এআই অ্যালগরিদম ব্যবহারের ফলে মহাকাশেই ছবি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়ে পরে বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে স্যাটেলাইট নিজেই ছবি ধারণ, বিশ্লেষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্যই শুধু পৃথিবীতে পাঠানো হয়। প্রযুক্তিবিদদের ভাষায়, এটি ‘এজ কম্পিউটিং’-এর একটি উদাহরণ।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে স্থাপনা ধ্বংস
মানবাধিকার সংগঠন পিস নাউ ও কেরেম নাভোটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩-২০২৫ সময়ে পশ্চিম তীরের এরিয়া সি ও দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংসের হার ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৯৬৬টি স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ১ হাজার ২৮৮টি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস করেছে বলেও ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী আমির দাউদের মতে, এআই বিশাল এলাকা দ্রুত পর্যবেক্ষণ করে সাম্প্রতিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে সহায়তা করে। তার দাবি, এর ফলে সতর্কবার্তা দেওয়া থেকে শুরু করে স্থাপনা ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সময় কমে যায়।
মানবিক সিদ্ধান্তে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ খালেদ সাফি সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়া স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তার মতে, কোনো মানুষের বাড়ি বা সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্তকে কেবল সম্ভাব্যতার হিসাব, ছবি ও তথ্যের ওপর নির্ভরশীল করে ফেললে সিদ্ধান্তের দায় কার তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গেও এসব ঘটনার যোগসূত্র তুলে ধরেছে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি বসতি স্থাপনের ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া এবং ১৮৫টি নতুন বসতি স্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে পশ্চিম তীরে ১১৮টি ফিলিস্তিনি রাখাল সম্প্রদায় উচ্ছেদের মুখে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো পশ্চিম তীরের এরিয়া সিতে অনলাইন ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থারও সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, ডিজিটাল এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে প্রশাসনিকভাবে ওই অঞ্চলের ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তির নির্দিষ্ট ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।





















