আন্তর্জাতিক

বহু বছরের মধ্যে সেরা দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন, স্বস্তিতে বাংলাদেশের হিন্দুরা

  প্রতিনিধি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ , ২:২৬:১৭ প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে এবারই সবচেয়ে ভালো দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করেছেন, এমনটিই দাবি করেছেন বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়। বড় ধরনের কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ছাড়াই উৎসব শেষ হওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতি নিশ্চিত করল এবং সারা বছর এই নিরাপত্তা বজায় রাখার পরীক্ষায় সরকার কতটা সফল হবে?

‘মনে রাখার মতো এক দুর্গাপূজা—ধন্যবাদ বাংলাদেশ!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন বাংলাদেশের নাগরিক সোহাগ কুমার মণ্ডল। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমরা এমন বাংলাদেশই দেখতে চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন।’

ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালের সঙ্গে কথা বলার সময় নাটোরের ২৯ বছর বয়সী প্রকৌশল স্নাতক সোহাগ বলেন, ‘এবার পরিস্থিতি অন্য রকম ছিল।’

তিনি বলেন, ‘নিজের শহরে প্রায় ২০টি পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেছি। সব জায়গাতেই প্রচুর মানুষের ভিড় ছিল, সবাই আনন্দ করছিলেন। দুর্গাপূজার সময় সাধারণত যে ভয় কাজ করে, এবার তা অনেকটাই কম ছিল।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘আমি একমত যে এ বছরের দুর্গাপূজা আগের বছরগুলোর তুলনায় ভালো হয়েছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।’

তিনি জানান, দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ানো, বরাদ্দ বৃদ্ধি, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন—সব মিলিয়েই এবারের উৎসবের পরিবেশ উন্নত হয়েছে।

দেবী দুর্গা ও তার সন্তানদের বিদায় জানানোর কয়েক দিন পরই বাংলাদেশের মানুষ এবারের দুর্গাপূজাকে সাম্প্রতিক স্মৃতিতে সবচেয়ে ভালো উৎসব হিসেবে বর্ণনা করছেন।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় পূজাকেন্দ্রিক অন্তত ৮৪টি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। এসব ঘটনার মধ্যে প্রতিমা ভাঙচুর এবং উৎসব বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টাও ছিল। এর আগের বছরগুলোতেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মিতভাবে প্রতিমা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার পর এটাই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। ফলে সরকারের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ; নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণেরও প্রয়োজন ছিল।

সরকার তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর দেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০০টি বেড়েছিল।

বাংলাদেশি-মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রব্বি ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালকে বলেন, এত বড় পরিসরে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার, বিরোধী দল এবং বৃহত্তর সমাজের মধ্যে সহযোগিতা জরুরি ছিল।

তার ভাষায়, ‘এ বছর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় কোনো বড় সমস্যা না হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে নির্বিঘ্নে পূজা আয়োজন নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দলসহ পুরো সমাজ সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে।’

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশকে সাধারণত আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভোটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে হিন্দু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারির নির্বাচনে কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠন বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার বার্তা দেওয়ার জন্য তারেক রহমানের কাছে দুর্গাপূজা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কয়েক সপ্তাহ আগেই এই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো। হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বর মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করলেও বাংলাদেশের হিন্দুরা চান, বছরের ৩৬৫ দিনই যেন এমন সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বজায় থাকে—এ জন্য যেন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন না হয়।

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরও প্রধান উৎসব এটি। সীমান্তের দুই পাশেই দুর্গাপূজা অন্যতম বৃহৎ উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলমান। তবে দেশটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যদিও মোট জনসংখ্যার তুলনায় তাদের অনুপাত ক্রমেই কমছে।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ হিন্দু। তারা দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ১৯৫১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭৪ সালে, পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের তিন বছর পর, সেই হার কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে। বর্তমানে তা ৮ শতাংশেরও নিচে।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং দুর্গাপূজাসহ তাদের ধর্মীয় উৎসবের সুরক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়।

শেখ হাসিনার শাসনামলেও দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক বিভিন্ন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা আরও বেড়ে যায়।

এ বছরও দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের উৎসব আয়োজনের সমন্বয়কারী বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ এমন ৩৪টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে।

ঢাকাভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম সেন্ট্রিস্ট নেশনের সম্পাদক কানিজ ফাতিমা ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালকে বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য হলো দেশের হিন্দুদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিমা ভাঙচুরের চেষ্টা ও মন্দিরে চুরিসহ অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে।’

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মহাষষ্ঠীর দিন ১৬ অক্টোবর ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের একদল শিক্ষার্থী গরু জবাই ও গরুর মাংসের ভোজের আয়োজন করেন। এ আয়োজনের পেছনে ছিল কট্টর ইসলামপন্থী দল খেলাফত মজলিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ছাত্রসংগঠনের সমর্থন। দুর্গাপূজার পর আয়োজনটি করার কথা থাকলেও তারিখ এগিয়ে আনা হয়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি হিন্দু মন্দিরের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

তবে কানিজ ফাতিমা বলেন, দুর্গাপূজার সময় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তার ভাষায়, ‘মানুষ আমাদের বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এবারই তারা সবচেয়ে ভালো দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করেছেন।’

একইভাবে মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘মোটের ওপর দুর্গাপূজা বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ছাড়াই শেষ হয়েছে। অতীতে দুর্গাপূজার সময় হিন্দুরা যে ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতেন, এ বছর তা অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল।’

এবারের দুর্গাপূজায় কী বদলেছিল? নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করার পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের সময়েও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

কানিজ ফাতিমা বলেন, ‘এবার দুর্গাপূজায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল।’ তিনি জানান, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বিশেষ অস্ত্র ও কৌশলগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলও দায়িত্ব পালন করেছে।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম টাইমস টুডের প্রতিবেদক জামাল রুহানি বলেন, গ্রামের পূজামণ্ডপগুলোর আশপাশেও চার থেকে পাঁচজন পুলিশ বা আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। অধিকাংশ পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা।

নিরাপত্তাকর্মীদের বিপুল উপস্থিতির পাশাপাশি এবার তাদের মোতায়েনের সময়ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকাভিত্তিক এক সাংবাদিক ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটালকে বলেন, ‘আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার পূজা শুরুর অনেক আগেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল। ফলে উৎসব শুরুর আগে মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভাঙচুর কিংবা হামলার ঘটনা মোটের ওপর এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রীও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।

ক্ষমতাসীন বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে এবং উৎসবে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা প্রতিরোধে সহায়তা করার নির্দেশ দেয়।

বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। দলটির প্রধান শফিকুর রহমান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রব্বির মতে, নির্বাচনী রাজনীতির প্রতিযোগিতাও শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনে ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ার পর বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই হিন্দু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে।’

রব্বি জানান, নির্বাচন-পরবর্তী ভোটার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিন্দু ভোটাররা জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকে বেশি সমর্থন করেছেন। তার মতে, এ পরিস্থিতি ক্ষমতাসীন দলকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন অর্জনে উৎসাহিত করতে পারে, বিশেষ করে তরুণ হিন্দুদের মধ্যে।

কানিজ ফাতিমার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটানো হতো, যাতে হিন্দু ভোট একত্র করা যায়।

তিনি বলেন, ‘প্রতিমা ভাঙচুরের পর তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত। এভাবে সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে তাদের ভোট আদায়ের চেষ্টা করা হতো—তারা ক্ষমতায় না থাকলে আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, এমন আশঙ্কা তৈরি করা হতো।’

শাফকাত রব্বির মতে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর পেছনে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলেরই রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

তার ভাষায়, ‘সংবাদমাধ্যমে হিন্দুদের ওপর হামলার খবর প্রকাশিত হলে বাংলাদেশের সরকার কিংবা বর্তমান বিরোধী দলের কারও লাভ নেই।’

রব্বি আরও বলেন, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার হিন্দুদের উৎসব নির্বিঘ্নে আয়োজনের এমন একটি কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছে, যেখানে অপ্রীতিকর ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তাই বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের জন্যই এই ধারা অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতে কে আরও ভালোভাবে নিরাপত্তা দিতে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করাই রাজনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত।’

কানিজ ফাতিমা জানান, সেন্ট্রিস্ট নেশন ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের খবর সংগ্রহ করতে ১০টি দল পাঠিয়েছিল। তারা কোথাও পূজা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা খুঁজে পায়নি।

বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার এক হিন্দু পুরোহিতও একটি ভিডিওতে বলেছেন, সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণই এবারের দুর্গাপূজাকে সফল করে তুলেছে।

তিনি বলেন, ‘উৎসব শান্তিপূর্ণ ছিল। ভক্তদের মধ্যে আমরা বিপুল উৎসাহ ও আনন্দ দেখেছি।’

দশমীর বিসর্জন শোভাযাত্রায় বাংলাদেশের হিন্দুদের বিপুল জনসমাগমের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বছর উৎসবের পরিসরও বড় ছিল। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে অন্তত ৩৩ হাজার ৮৫১টি দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫। অর্থাৎ এক বছরে পূজার সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি।

তবে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বক্তব্য, এবারের দুর্গাপূজায় যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছে, তা যেন শুধু চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘হ্যাঁ, কঠোর নিরাপত্তার কারণে বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমরা চাই, সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি ছাড়াই দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, শুধু দুর্গাপূজার পাঁচ দিন নয়, বছরের ৩৬৫ দিনই যেন হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদে থাকতে পারেন।’

তিনি বলেন, শুধু নিরাপদে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের ব্যবস্থা করলেই যথেষ্ট নয়। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

তার দাবি, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের এখনো শাস্তি হয়নি। অন্যদিকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসও এখনো কারাগারে রয়েছেন।

মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা ব্যক্তিরা এখনো বাইরে থাকায় দেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় রয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং তাদের উপাসনালয় ভাঙচুরের বহু ঘটনায় অপরাধীরা প্রায়ই শাস্তি এড়িয়ে যায়।

তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বিরোধিতা করে এমন মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু তারা কারা, এককভাবে কাজ করছে নাকি কোনো সংগঠন বা দলের অংশ—তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এ ধরনের ঘটনার তদন্তে সরকারের খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয় না।’

আপাতত এ বছরের দুর্গাপূজা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে তারেক রহমানের সরকার এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সমাজের জন্য প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি।

সেই পরীক্ষা হলো, বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে সারা বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না।

আরও খবর

Sponsered content