প্রতিনিধি ১৯ আগস্ট ২০২৬ , ২:৩৫:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় ডারউইনকে ক্রিকেটের মানচিত্রে নতুন করে তুলে ধরেছে। এবার উত্তরাঞ্চলীয় এই শহরটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে। দুই দশক অপেক্ষা করে আরেকটি টেস্ট আয়োজন করতে না হয়, সেটিই এখন স্থানীয় ক্রিকেট প্রশাসকদের প্রধান লক্ষ্য।
মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের পর মাঠের পিচও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ম্যাচের দায়িত্বে থাকা আইসিসির ম্যাচ রেফারি রিচি রিচার্ডসনের কাছ থেকে মাঠটি সর্বোচ্চ নম্বর পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। মাঠের পরিচর্যাকারী জ্যাক পাভলিচের তৈরি পিচে পুরোনো ধাঁচের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টেস্ট ক্রিকেট দেখা গেছে। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের পিচও প্রশংসিত হয়েছিল।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই আগামী বছরের আগস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজ-পরবর্তী দুটি একদিনের ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে ডারউইনকে নির্ধারণ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠেয় আগামী বছরের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের আগে এই সিরিজটি অনুষ্ঠিত হবে।
নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেট নিউজিল্যান্ড সিরিজে তৃতীয় একটি ম্যাচ আয়োজনেও আগ্রহী। তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান টড গ্রিনবার্গ জানিয়েছেন, কেয়ার্নস ও ম্যাকাইও সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। আগামী সপ্তাহের বাংলাদেশ সিরিজের শেষ টেস্ট দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক হচ্ছে ম্যাকাইর।
গ্রিনবার্গ বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চলে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেটের প্রধান গ্যাভিন ডোভি আশাবাদী। তাঁর মতে, ডারউইনে অনুষ্ঠিত চার দিনের টেস্টে ১৫ হাজারের বেশি দর্শক এসেছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি এসেছেন অন্য রাজ্য থেকে। এই সাফল্য ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের পথ খুলে দিতে পারে।
ডোভি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আয়োজনটি এতটাই ভালো হয়েছে যে এসব সমস্যার কিছুটা সমাধান করা সম্ভব।’
ডারউইনে ২০০৪ সালের পর প্রথম টেস্ট আয়োজনের পর তিনি বলেন, ‘২০২৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচগুলো শেষ হলে আমি আশা করি নর্দার্ন টেরিটরি সরকার ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বসে আলোচনা করতে পারব। তখন জানতে চাইব, ভবিষ্যৎ সফরসূচি কেমন হবে এবং আগামী তিন বছরে আমরা কী করতে পারি।’
‘আদর্শ পরিস্থিতি হবে, আমরা যদি টানা ছয় বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করতে পারি। অতীতে যা হয়েছে, তার তুলনায় সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।’
‘আমরা এখন দারুণ অবস্থানে আছি। গত বছর টি-টোয়েন্টি হয়েছে, এ বছর টেস্ট হয়েছে, আগামী বছর একদিনের ম্যাচ হবে। অর্থাৎ তিন ধরনের ক্রিকেটই আয়োজন করে নিজেদের সক্ষমতা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছি।’
‘তবে এই সপ্তাহটা এতটাই ভালো গেছে, এতটাই অসাধারণ ছিল যে আমি এখানে আরও বেশি টেস্ট ক্রিকেট দেখতে চাই।’
২০২৭ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ব্যস্ত সূচি শেষ হওয়ার পর তাদের আন্তর্জাতিক সূচি কেমন হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আগামী বছরের পরের ভবিষ্যৎ সফরসূচিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এখনো চূড়ান্ত করেনি।
ভবিষ্যতে সব দেশই হয়তো তুলনামূলক কম টেস্ট খেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের কাঠামো বজায় থাকলে বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইনের মতো শীতকালীন সময়ে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত সিরিজগুলো চালু থাকতে পারে।
ডারউইনের পাশাপাশি উত্তর কুইন্সল্যান্ডের ম্যাকে, কেয়ার্নস ও টাউনসভিলের মতো শহরগুলোর জন্যও সেটিই টেস্ট ক্রিকেট পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে। এসব এলাকায় অস্ট্রেলিয়ার শীতকালীন সময়ে আবহাওয়া ক্রিকেটের জন্য বেশ উপযোগী।
তবে শুরুতে সীমিত ওভারের ক্রিকেট আয়োজনই বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন গ্রিনবার্গ।
তিনি বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট আয়োজন হয়তো কঠিন হবে। তবে এখানে সীমিত ওভারের ক্রিকেট আয়োজনের জন্য আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা রয়েছে।’
‘বছরের এই সময়ে এমন তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার মধ্যে ক্রিকেট আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট যেন এখানে খুব কম সময়ের জন্যই থেমে থাকে। তাই বছরের এই সময়ে এখানে ক্রিকেট আয়োজনের দারুণ সুযোগ রয়েছে। আমাদের সেটি চালিয়ে যাওয়া উচিত।’
তবে ডারউইনের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় ক্রিকেট আয়োজনের সবচেয়ে বড় সমস্যা খরচ। গ্রিনবার্গ বলেন, ‘এ ধরনের জায়গায় আসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখানে ক্রিকেট নিয়ে আসতেও অনেক খরচ হয়। আমাদের সম্প্রচার সহযোগীরাও ডারউইনের মতো জায়গায় ক্রিকেট নিয়ে আসার ব্যয় সম্পর্কে জানেন।’
‘সরকার ও পর্যটন সংস্থাগুলোর সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহযোগিতায় আমাদের কিছু খরচ কমানো সম্ভব। তবে আমরা এখানে আসতে পেরে সত্যিই আনন্দিত। এখানকার ছেলে-মেয়েরা যদি অস্ট্রেলিয়া দলের তারকাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়, পরে ক্রিকেট খেলে এবং সারাজীবন ক্রিকেটের ভক্ত হয়ে ওঠে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।’
এদিকে এই সপ্তাহে শুরু হওয়া টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা নিয়েও বেশ আশাবাদী ডোভি। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার পর এটিকে দ্বিতীয় সারির বড় প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবার অ্যাডিলেড, হোবার্ট, ভিক্টোরিয়া ও অস্ট্রেলীয় রাজধানী অঞ্চলের দল অংশ নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে খেলবে নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ও নেপালের দল। নর্দার্ন টেরিটরি স্ট্রাইক দলের নেতৃত্ব দেবেন কুইন্সল্যান্ড ও ব্রিসবেনের সাবেক কোচ ইয়োহান বোথা।
মারারা স্টেডিয়ামের পিচে ছয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর চলতি মাসের শেষ দিকে নারী অস্ট্রেলীয় ফুটবল লিগের ম্যাচ আয়োজনের জন্য পিচটি সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রতিযোগিতার ৩০টি ম্যাচের অনেকগুলোই অনুষ্ঠিত হবে রাতে।
ডোভি বলেন, ‘গত বছর বিভিন্ন দিক থেকে এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছিল। উপমহাদেশে আমরা বিপুল দর্শক পেয়েছিলাম।’
‘অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় খেলা কোচ ও খেলোয়াড়রা যখন এটিকে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সেরা টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হিসেবে আলোচনা করেন, তখন সত্যিই ভালো লাগে।’
‘আমি মনে করি, এটি আমাদের অগ্রগতিরই প্রতিফলন। এখন আন্তর্জাতিক দল ও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়রাও এখানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। গত বছর আমাদের সম্প্রচারও অসাধারণ ছিল, বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করা যায়।’
‘আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে এটিকে আমরা দারুণ একটি আয়োজন এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে শীতকালীন ক্রিকেট কেমন হতে পারে, তার চমৎকার উদাহরণ হিসেবে মনে করছি।’
মজার বিষয় হলো, গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার বিপর্যয়ের পেছনে এই প্রতিযোগিতারও সামান্য ভূমিকা থাকতে পারে।
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ নয়টি উইকেট নিয়েছেন। তিনি ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এইচপি দলের হয়ে খেলেছিলেন। প্রথম ইনিংসে শতরান করা তানজিদ হাসানও ২০২৪ সালের আসরে একই দলের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
আরও আগে, বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ২০১৭ সালে বাংলাদেশের এইচপি দলের হয়ে ডারউইনে খেলেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে ১১ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা ডোভি এখন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট রাজ্য বা অঞ্চলভিত্তিক ক্রিকেট সংস্থার দায়িত্বে। গত সপ্তাহের ঐতিহাসিক ফলাফলের পর তার অনুভূতিতে অবশ্য কিছুটা দ্বন্দ্ব ছিল।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি কঠিন। কারণ আয়োজনটি দারুণ সফল হয়েছে।’
‘সবাই এখন ডারউইনের প্রশংসা করছে, সবাই টেস্ট ক্রিকেটের কথা বলছে। পুরোনো ধাঁচের টেস্ট পিচ ও ম্যাচ, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের এমন ঐতিহাসিক জয়, যেখানে তারা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা দলকে হারিয়েছে। এসবই নর্দার্ন টেরিটরির ক্রিকেটের জন্য দারুণ।’
‘তবে একই সঙ্গে আমি অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের জন্যও খারাপ লাগছে। তারা অনেক সমালোচনার মুখে পড়ছে। অথচ তারা ভালো খেলোয়াড়, দলের প্রতি গভীরভাবে দায়বদ্ধ। শুধু এবার তারা বাংলাদেশের কাছে খেলায় পরাস্ত হয়েছে।’





















