সারাদেশ

মাধবপুরে দুর্ধর্ষ মাটি খেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অসহায় কৃষক ও সাধারণ মানুষ

  মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি ২১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:৫০:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় একটি দুর্ধর্ষ মাটি খেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছে কৃষিজমির মালিকসহ সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্য দিবালোকে ফসলি ও উর্বর জমি কেটে অবাধে মাটি উত্তোলন চললেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না প্রশাসন—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছাতিয়াইন রোডসংলগ্ন পলাশ ব্রিক ফিল্ড এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে কামরুল মিয়া ও মোশারফের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ভেকু ব্যবহার করে ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন করে দিনরাত বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছে। একই সিন্ডিকেট ছাতিয়াইন বাজারসংলগ্ন পলাশ ব্রিক ফিল্ডের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নিয়মিত মাটি কাটা ও পরিবহন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এদের একটি সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনী রয়েছে। কেউ অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই তাকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গেও এই সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসলি জমি থেকে এভাবে মাটি উত্তোলন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি আইন ও দণ্ডবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে প্রকাশ্যে এসব অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা চোখে না পড়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গত ১৩ জানুয়ারি ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন নাগরিকরা পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাধবপুর থানার এসআই নাজমুল হাসান ছাতিয়াইন পুলিশ ফাঁড়ির সহায়তায় ওই রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পান। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

পরদিন মাধবপুর উপজেলা প্রশাসন ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করলে সাময়িকভাবে মাটি উত্তোলন বন্ধ রাখে সিন্ডিকেট। পরে ১৭ জানুয়ারি ছাতিয়াইন পুলিশ ফাঁড়ির সহায়তায় থানা পুলিশ সিন্ডিকেটের মূলহোতা কামরুল মিয়া (৪০)কে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন মহল থেকে তদবির শুরু হয়। এমনকি পুলিশকে হয়রানি করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কামরুলকে আদালতে প্রেরণের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাজমুল হাসানকে হেয় করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাংবাদিকদের ভুল তথ্য সরবরাহ করে বিভিন্ন পত্রিকায় বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের চেষ্টা চালাচ্ছে সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগও উঠেছে। এদিকে গ্রেপ্তারের পরদিন জামিনে বেরিয়ে কামরুল আবারও আগের ন্যায় ভেকু দিয়ে মাটি উত্তোলন করে পাচার শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে ছাতিয়াইন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর খননের নামে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অতিরিক্ত গভীরভাবে খনন করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এত গভীর খননের ফলে সেখানে ভবিষ্যতে মাছ চাষ করাও সম্ভব হবে না। তবে সিন্ডিকেটের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “পুলিশ যদি ব্যবস্থা নেয়, তাদেরও নাকানিচুবানি খেতে হয়। আমরা সাধারণ মানুষ কথা বললে কী হবে—ভাবতেই ভয় লাগে।”

এদিকে প্রশাসনের প্রতি এলাকাবাসীর দাবি—এই মাটি খেকো সিন্ডিকেটের সব সদস্যকে আইনের আওতায় এনে অবৈধ মাটি উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হোক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ বিন কাশেম বলেন, “এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

উল্লেখ্য, এটাই প্রথম নয়। এর আগেও গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নোয়াপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল মোতাকাব্বির বাদী হয়ে কামরুল মিয়াকে প্রধান আসামি করে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫(১) ধারায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় একটি ভেকু ও একটি ড্রাম ট্রাক জব্দ করা হয়। মাধবপুর থানার মামলা নম্বর-৩২। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে মাধবপুর থানায় দাঙ্গা ও হত্যাচেষ্টা মামলা এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় একটি হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content