নওগাঁ প্রতিনিধিঃ ৬ অক্টোবর ২০২৬ , ৯:০৫:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ
নওগাঁর মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. খোরশেদ আলমকে জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলে মান্দা থানার নতুন ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে মো. আফজাল হোসেনকে। একই আদেশে বদলগাছী থানার ওসি করা হয়েছে মো. হাবিবুর রহমানকে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এসব বদলি ও পদায়নের কথা জানানো হয়। আদেশে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনস্বার্থে এসব বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক মো. আফজাল হোসেনকে ওআর হেডকোয়ার্টার থেকে বদলি করে মান্দা থানার ওসি করা হয়েছে। একইভাবে নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমানকে ওআর হেডকোয়ার্টার থেকে বদলি করে বদলগাছী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে মান্দা থানার ওসি মো. খোরশেদ আলমকে জেলা গোয়েন্দা শাখার নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মান্দা থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন খোরশেদ আলম। এর আগে তিনি নওগাঁ সদর মডেল থানার তদন্ত ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মান্দা থানায় দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক উদ্ধার ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হন খোরশেদ আলম।
গত ১১ আগস্ট নওগাঁ পুলিশ লাইন্স ড্রিলশেডে জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা এবং পরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ সভায় তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক ও উপহারসামগ্রী তুলে দেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই মাসের সার্বিক মূল্যায়নে জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। একই সভায় মান্দা থানার এসআই আশিশ কুমার স্যানালও জেলার শ্রেষ্ঠ এসআই নির্বাচিত হন।
এরপর আগস্ট মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নেও রাজশাহী রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে নির্বাচিত হন খোরশেদ আলম। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পদ্মা কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ সভা ও রেঞ্জ কনফারেন্সে তাঁকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
অপরাধ দমন, মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, সাজাপ্রাপ্ত আসামির ওয়ারেন্ট তামিল ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নওগাঁ জেলা পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তাকে ওই অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে খোরশেদ আলম ছিলেন।
খোরশেদ আলম মান্দা থানার ওসি থাকাকালে মাদকবিরোধী একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে গত ২৬ জুন ভারশোঁ ইউনিয়নের ভারশোঁ ঋষিপাড়ায় ডলি রানী ঋষি নামের এক নারীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি আলোচনায় আসে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে ৫০ লিটার চোলাই মদ তৈরির উপাদান (ওয়াশ) ও মাদক বিক্রির নগদ ৮১ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় ডলি রানীর স্বামী সমোর সাহা ওরফে সুমন পালিয়ে যান বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসআই আশীষ কুমার সান্যালের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশের দাবি, বাড়ির আঙিনায় মাটির নিচে গর্ত করে লুকিয়ে রাখা ওয়াশ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ডলি রানীর হেফাজত থেকে নগদ টাকা জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয় এবং ডলি রানীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে ওই অভিযান নিয়েই পরবর্তীতে প্রশ্ন তোলেন ডলি রানীর স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের অভিযোগ, অভিযানের সময় ডলি রানীর স্বামী বাড়িতে ছিলেন না। এরপরও বাড়ির দরজা ভেঙে পুলিশ অভিযান চালায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বাড়িতে জমি বন্ধক ও গরু বিক্রির গচ্ছিত টাকা ছিল। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই টাকা উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ডলি রানীর ছেলেকেও থানায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, উদ্ধার করা টাকার পরিমাণ এবং জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা টাকার অঙ্কের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। এ ঘটনায় তাঁরা পুলিশের অভিযান, জব্দ প্রক্রিয়া ও আচরণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়াও মান্দা ফেরিঘাট বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের নির্মাণাধীন বিগ ক্যান্টিলিভার নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও আলোচনায় আসে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নির্মাণকাজ চলাকালে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কাজের মান, নির্মাণসামগ্রী এবং রাতে সরকারি প্রকল্পের কাজ করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
পরে খবর পেয়ে ওসি খোরশেদ আলম পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান ও উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ রানাকে তিনি ধমক ও হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে খোরশেদ আলম জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকারি কাজে সাধারণ মানুষের বাধা দেওয়ার এখতিয়ার নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পরদিন সকালে ফের নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্থানীয়রা কাজের বেইজ, সাব-বেইজ, আরসিসি, রড, সিমেন্ট, ইট ও খোয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সওজের এসডিও সুলতানা খানম জানিয়েছিলেন, যানজট ও জননিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাতে ক্যান্টিলিভার স্থাপনের কাজ করা হচ্ছিল। তবে সিডিউল অনুযায়ী রাতে কাজ করা ঠিক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
খোরশেদ আলমের দায়িত্ব পালনকাল নিয়ে মান্দার বিভিন্ন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, মাদক বিক্রির নির্দিষ্ট পয়েন্ট ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ, মিথ্যা মামলায় মানুষকে ফাঁসানো, হত্যা মামলার চার্জশিটে অনিয়ম, জমিসংক্রান্ত বিরোধকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং জমির দলিল আটকে রাখার মতো অভিযোগ।
এ ছাড়া মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে হয়রানি এবং জমি নিয়ে বিরোধে এক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
স্থানীয় কয়েকজনের আরও অভিযোগ, এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে তুলনামূলকভাবে ছোট পর্যায়ের মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, এতে মাদকের মূল নেটওয়ার্ক কতটা নিয়ন্ত্রণে আসছে। এ ছাড়া এসআই জাকিরুল ইসলামের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন তিনি দায়িত্ব পালনকালে জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক উদ্ধার ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তারে তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। অন্যদিকে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় কিছু অভিযান ও পুলিশের আচরণ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন ও অভিযোগও উঠেছে।
তবে পুলিশের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
সবশেষে গত ৬ অক্টোবর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে খোরশেদ আলমকে মান্দা থানার ওসি পদ থেকে সরিয়ে জেলা গোয়েন্দা শাখায় নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
অফিস আদেশে তাঁর বদলির কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শুধু ‘জনস্বার্থে’ বদলি ও পদায়নের কথা বলা হয়েছে।
মান্দা থানায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মো. আফজাল হোসেন। এখন নতুন ওসির নেতৃত্বে মান্দা থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদকবিরোধী অভিযান ও সাধারণ মানুষের পুলিশি সেবা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের। অন্যদিকে ডিবিতে নতুন দায়িত্ব পাওয়া খোরশেদ আলমের অভিজ্ঞতা জেলা পর্যায়ের অপরাধ দমন ও তদন্ত কার্যক্রমে কীভাবে কাজে আসে, সেটিও দেখার বিষয়।















