অপরাধ

কাশিয়ানীতে নারী উদ্যোক্তা ও শিশু উন্নয়ন কর্মী শরীফা নাহারকে প্রাণনাশের হুমকি

  শেখ শোভন আহমেদ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:৩৮:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ


গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় থাকার কারণে এক নারী উদ্যোক্তা ও শিশু উন্নয়ন কর্মী শরীফা নাহারকে ধারাবাহিকভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর দাবি, ইসলাম ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী চিন্তাধারার একটি অজ্ঞাত গোষ্ঠী এই হুমকি দিচ্ছে।

ভুক্তভোগী শরীফা নাহার কাশিয়ানী থানার শংকর পাশা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আব্দুর রহমান ও জারিফুন নেছার কন্যা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। নিজস্ব প্রতিষ্ঠান “ইউনিক হ্যান্ডিক্রাফটস অ্যান্ড বুটিক”–এর মাধ্যমে তিনি গ্রামের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তুলছেন। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা, নারীর অধিকার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তিনি প্রকাশ্যে কাজ করে আসছেন।

এছাড়াও ঢাকায় অবস্থিত একটি চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার-এ তিনি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ও ডে-কেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যেখানে শিশুদের আধুনিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার এসব কর্মকাণ্ডকে এলাকার কিছু ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী ব্যক্তি ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থাকে তারা তাদের ধর্মীয় আদর্শের পরিপন্থী মনে করছেন। এর জেরে শরীফা নাহারকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে হত্যার ভয় দেখানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগী জানান, ০১৭১১-৬২০৭০৫ নম্বরসহ একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের মাওলানা রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তার সামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধে চাপ প্রয়োগ করে।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মর্জিনা বেগমের ১৩ বছর বয়সী নাবালিকা কন্যাকে এলাকার ৪২ বছর বয়সী ব্যক্তি হাফিজ খানের সঙ্গে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে শরীফা নাহার স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের সহায়তায় তা প্রতিরোধ করেন।

এই ঘটনার পর থেকেই হাফিজ খান প্রকাশ্যে শরীফা নাহারকে “দেখে নেওয়ার” হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সবচেয়ে গুরুতর হুমকির ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ৯টার দিকে। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, ০৯৬৯৭০১৬১৫০ নম্বর থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়—তিনি যদি নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা সংক্রান্ত সব সামাজিক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না করেন, তবে তাকে, তার স্বামী ও কন্যাকে হত্যা করা হবে।

মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং নারী অধিকার, শিশু সুরক্ষা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতার কারণে লক্ষ্যভিত্তিক নিপীড়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

স্থানীয় পর্যায়ে অভিযুক্তদের সামাজিক প্রভাব থাকায় ভুক্তভোগীর পক্ষে কার্যকর নিরাপত্তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত মাওলানা রফিকুল ইসলাম ও মৌলভী হাফিজ খান একই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ভুক্তভোগী শরীফা নাহার বলেন, “আমি শুধু নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেছি। কিন্তু সেই কাজের জন্যই আজ আমার জীবনসহ স্বামী ও সন্তানের জীবন চরম হুমকির মুখে।”

গত ২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি কাশিয়ানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন। তবে জিডির পর অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং তাকে ও তার পরিবারকে খুঁজতে থাকে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রাণের ভয়ে বর্তমানে তিনি পরিবারসহ নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

আরও খবর

Sponsered content