বিশেষ প্রতিবেদন | রাজশাহী থেকে ৮ আগস্ট ২০২৫ , ১২:০৮:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ
পাড়ার মোড়ে একসময় যিনি মুদি দোকানে বিক্রি করতেন চানাচুর আর বিস্কুট, তিনিই এখন কয়েকশ কোটি টাকার মালিক। ঘরে ঘরে আলো জ্বালানো সেই মুদি দোকানির নাম মোখলেসুর রহমান মুকুল—যিনি এখন ‘হুন্ডি মুকুল’ নামে কুখ্যাত। তার বিরুদ্ধে হুন্ডি, প্রতারণা, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নসহ অভিযোগের পাহাড়।
একই সাথে তিনি এক চোরাকারবারি, এক প্রভাবশালী ঠিকাদার, রাজনৈতিক দানব এবং দেশজুড়ে গড়ে তোলা কালো অর্থনীতির এক নেপথ্য কারিগর।
কাশিয়াডাঙ্গার মানুষ তাকে এক নামে চেনে। অথচ আয়কর রিটার্নে তিনি এখনো ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী’ হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। অথচ শুধু রাজশাহীতেই তার নামে থাকা সাততলা ভবনের মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দুটি দামি গাড়ি, ৪০ বিঘা জমি এবং মক্কা-মদিনায় দুটি হোটেলের মালিক তিনি। এসব কীভাবে হলো?
সূত্র জানায়, মুকুল দীর্ঘদিন ধরে হুন্ডি ব্যবসার শীর্ষে রয়েছেন। ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ নানা দেশে অর্থ পাচার করেছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মুন এন্টারপ্রাইজ, যার আড়ালে চলে কোটি কোটি টাকার হুন্ডি অপারেশন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারি কাজ পেতে রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করেছেন মুকুল। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ছত্রছায়ায় তিনি গত ৩ বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ পান।
রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক এমপি আসাদুজ্জামান আসাদকে একটি গাড়ি উপহার দিয়ে দুটি বালুঘাট দখলে নেন। পুরো সিস্টেমই যেন কিনে নিয়েছিলেন মুকুল।
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১০ কোটি টাকার চেক প্রতারণার অভিযোগে তাকে লিগ্যাল নোটিশ দেন গোলাম সারওয়ার নামের এক ব্যবসায়ী। অভিযোগ অনুসারে, ব্যবসায়িক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ফাঁকা চেকে সই করিয়ে ৯.৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মুকুল ও তার নেটওয়ার্ক।
চেকগুলো এখনো ফেরত দেননি, বরং উল্টো হিসাব দিতে কালক্ষেপণ করছেন।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ভারতের কুখ্যাত পাচারকারী এনামুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মুকুলের। এনামুলের কাছ থেকে এক হাজার কোটি রুপি পেয়েছিলেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অর্ধেক ফেরত দিলেও বাকি টাকা নিজের কাছে রেখে দেন।
সেই টাকাই ছিল তার অবৈধ ব্যবসার মূল পুঁজি। হুন্ডির মাধ্যমে আয় করা টাকা দিয়ে বৈধ প্রকল্পে লগ্নি করে মুকুল ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ‘সাদা কোটের কালো সম্রাট’।
বিস্ময়করভাবে, আত্মগোপনে থাকার সময়ও তিনি রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে স্বাক্ষর করে গোদাগাড়ীর একটি বালুমহালের ইজারা পান। এই ঘটনাটি জানাজানি হতেই রাজশাহীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন উঠেছে—কে এই মুকুলের পেছনে? কাদের ছায়া তার মাথার উপর? কে তাকে আইন, প্রশাসন ও রাজনীতির চোখ ফাঁকি দিতে এতটা সক্ষম করল?
মুখোশ খুলে পড়েছে হুন্ডি মুকুলের। কিন্তু এক মুকুলই কি শেষ? নাকি তার মতো আরও শত শত মুকুল দেশে ছড়িয়ে আছে, যারা টাকার জোরে আইন, শাসন ও নীতির সবকিছু পায়ে দলে বেড়াচ্ছে?
আজ যে মোখলেস ধরা পড়েছে, কাল হয়তো আরেকজন উঠে আসবে—যদি না অবৈধ অর্থনীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।





















