দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, দমন-পীড়ন, কারাবাস ও নির্বাসনের ইতিহাস পেরিয়ে আসার ফল। দলের অসংখ্য নেতাকর্মী বছরের পর বছর কারাগারে ছিলেন, কেউ গুম হয়েছেন, কেউ প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কারাবাস ও দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটাতে হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও কারাভোগ করেছেন; ব্যক্তিগত জীবনে সহ্য করেছেন সন্তানের মৃত্যুজনিত গভীর শোক। শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল—ত্যাগের এই বৃত্তান্ত বিস্তৃত ও বেদনাময়।
কিন্তু রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৪১ জনই নতুন মুখ—যা একদিকে সম্ভাবনার, অন্যদিকে অভিজ্ঞতার ঘাটতির ইঙ্গিত বহন করে। প্রবীণ ও নবীনের এই সমন্বয়কে কার্যকর করতে হলে নীতিনির্ধারণে পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনীতি হবে সরকারের প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা। সরকার গঠনের দিন দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে নতুন সরকার। ব্যয়ের খাতও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অন্তর্বর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে বেতন বৃদ্ধি ও ভাতা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে; তার ধারাবাহিক চাপ এখন সরকারের ওপরই বর্তাবে।
সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ আসছে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল থেকে। এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন না করলে সরকারি চাকরিজীবীদের অসন্তোষ বাড়বে; আর বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করা বা কর বৃদ্ধি—দুই পথের একটিতে হাঁটতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই জনমত ব্যবস্থাপনা কঠিন। অর্থাৎ এটি নিছক আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক বিচক্ষণতারও পরীক্ষা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অবহেলার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তী সময়ে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুক্তি এবং রাজধানীকেন্দ্রিক অপরাধতৎপরতার পুনরুত্থান জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংগঠিত অপরাধ দমনে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ না নিলে সরকার দ্রুত চাপে পড়বে। একইভাবে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ নিয়ে অসতর্ক বয়ান রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে কিছু ঘটনাকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা যেমন ছিল, তেমনি সবকিছুকেই অবজ্ঞা করার প্রবণতাও বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার আলোকে স্পষ্ট—চরমপন্থা ও সহিংস উগ্রবাদকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, নিরাপত্তা ও আইনের নিরিখেই মোকাবিলা করতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে সন্ত্রাসবাদবিরোধী কঠোর অবস্থানের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেটির বাস্তব প্রতিফলন জরুরি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রা পায়। অন্তর্বর্তী সময়ে একে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি; বরং কখনও কখনও তা ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনরোষের রাজনীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা—এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংস্কার প্রস্তাব—সব মিলিয়ে একটি জটিল বিরোধী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে; স্থানীয় পর্যায়ে কার্যালয় খোলা ও দলীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় প্রত্যাবর্তন তাদের অধিকার, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতার জায়গা সীমিত—এ সত্য ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে।
অন্যদিকে সংস্কার ইস্যুতে জনমতের বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শপথের দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত আইনসম্মত হলেও জনপরিসরে প্রশ্ন তুলেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা অন্যান্য সংস্কারপ্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে ভবিষ্যৎ বিতর্কও সরকারের সামনে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সংস্কারবিরোধী নয়—বরং যুক্তিনির্ভর, বাস্তবসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি।
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান হবে সরকারের নৈতিক শক্তির মাপকাঠি। অতীতে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক ও কলঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তার ভার এখনও পুরোপুরি ঝরেনি। নতুন সরকার যদি প্রশাসন, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে সেটিই হবে রাজনৈতিক পুঁজি।
সবশেষে দলীয় ঐক্য রক্ষা অপরিহার্য। মনোনয়নকেন্দ্রিক অসন্তোষ, বিদ্রোহী প্রার্থী, স্থানীয় কোন্দল—এসব দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনকে দুর্বল করে। ক্ষমতায় থেকে দল গোছানো কঠিন; তবু শুরুতেই শৃঙ্খলা ও সংলাপের পথ না নিলে ভেতরের অসন্তোষই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সংযম ও কর্মদক্ষতা। এই মেয়াদেই নির্ধারিত হবে—বিএনপি কেবল প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা একটি দল, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম ও দায়িত্বশীল একটি রাজনৈতিক শক্তি। আগামী পাঁচ বছরই তার প্রমাণের সময়।


























