সম্পাদকীয়

ভেনেজুয়েলা সংকট: গণতন্ত্র নয়, তেলের দখলই ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য

  এটিএম রাকিবুল বাসার ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:০১:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য আর গোপন নেই। প্রকাশ্যেই তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের মন জোগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্য দিয়েই কারাকাসকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—প্রথমে রাজনৈতিক চাপ ও বলপ্রয়োগ, এরপর আইনি নিশ্চয়তার আশ্বাস, আর সবশেষে করপোরেট মুনাফার হিসাব।

মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ‘পূর্ণ নিরাপত্তা’ দেওয়া হবে। এই ঘোষণাই বলে দেয়—এই অভিযানের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা। এটি কোনোভাবেই মার্কিন জনগণের জ্বালানির দাম কমানোর পরিকল্পনা নয়, কিংবা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনের কোনো মানবিক উদ্যোগও নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় শক্তিকে ব্যবহার করে অন্য দেশের সার্বভৌম সম্পদকে করপোরেট মুনাফার জন্য ‘নিরাপদ’ করে তোলার সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের আরেকটি অধ্যায়।

ভেনেজুয়েলার প্রতি এই আগ্রহের কারণ স্পষ্ট। দেশটির প্রমাণিত তেল মজুদ ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অব্যবহৃত জ্বালানি ভাণ্ডার। তবে জ্বালানি ও অর্থনীতির মহলে একটি বাস্তবতা সুপরিচিত, যদিও খুব কম উচ্চারিত হয়—এই সম্পদ তখনই পুঁজির কাছে মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রিত বা ‘নিরপেক্ষ’ থাকে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তেলই মূল দ্বন্দ্ব

ট্রাম্প প্রশাসনের এই তেল দখলের প্রচেষ্টা হঠাৎ শুরু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সংঘাত, ঠিক যেমনটি একসময় ইরানে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ঘটেছিল, মূলত তেল নিয়ন্ত্রণের লড়াই। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে মার্কিন বেসরকারি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করতে চান।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুইদোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছিলেন—ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বড় অংশীদার করা হবে। এটি ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে মৌলিক বিচ্ছেদ, যেখানে তেল খাতের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য। গুইদোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কার্লোস ভেক্কিও পর্যন্ত স্বীকার করেন, ‘তেল উৎপাদনে বেসরকারি খাতকে প্রধান ভূমিকা দিতে চাই।’

ভৌগোলিক সুবিধা ও করপোরেট লোভ

সমাজবিজ্ঞানী মারিয়া পাইয়েজ ভিক্টরের বিশ্লেষণ এই লড়াইয়ের আরেকটি দিক স্পষ্ট করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে তেল পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ৪৩ দিন লাগে, সেখানে ভেনেজুয়েলা থেকে লাগে মাত্র চার দিন। এই ভৌগোলিক সুবিধাই ভেনেজুয়েলার তেলকে করপোরেট দৃষ্টিতে অমূল্য করে তুলেছে। তার কথায়, ভেনেজুয়েলা যদি তেল নয়, আম উৎপাদন করত, তাহলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কখনোই ওয়াশিংটনের উদ্বেগের বিষয় হতো না।

চাভেজ সরকার যখন পিডিভিএসএ’র ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং কর বাড়িয়ে তেলের রাজস্ব জনকল্যাণে ব্যয় করতে শুরু করে, তখনই সংঘাত তীব্র হয়। সামাজিক ব্যয়ে ব্যবহৃত তেল আয়ের ধারণা করপোরেট স্বার্থের জন্য ছিল অসহনীয়।

সম্পদ দখল ও করপোরেট সুবিধাভোগী

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটগোর পরিচালনা পর্ষদ গুইদোর অনুগতদের দিয়ে সাজানো হয়। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভেনেজুয়েলার ১.২ বিলিয়ন ডলারের সোনা আটকে রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। এসব সম্পদ গুইদোর নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই প্রেক্ষাপটে এক্সনমোবিল, কোচ ব্রাদার্সের মতো করপোরেশনগুলোর আগ্রহ ছিল সর্বাধিক। ট্রাম্পের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন নিজেই ছিলেন এক্সনের সাবেক প্রধান নির্বাহী। অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্রেগ প্যালাস্টের মতে, কোচদের টেক্সাসভিত্তিক রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। চাভেজ যখন সেই তেলের দাম বাড়ান, তখনই সরকার পরিবর্তন তাদের কাছে ব্যবসায়িক ‘প্রয়োজন’ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

গুয়াতেমালা (১৯৫৪), চিলি (১৯৭৩) কিংবা ইরাক যুদ্ধ—ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাষ্ট্র উৎখাতের পর করপোরেট বিনিয়োগ বাড়ে, আর সামাজিক ব্যয় কমে। ইরাকে হ্যালিবার্টনের বিলিয়ন ডলারের চুক্তির বিপরীতে জনগণের ভাগ্যে জোটে ধ্বংসস্তূপ।

একটি প্রচলিত ধারণা হলো—তেল কোম্পানিগুলো বেশি তেল তুলতে চায়। বাস্তবে তারা চায় নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত সরবরাহ দাম কমায়, যা তাদের স্বার্থবিরোধী। ভেনেজুয়েলার তেল দখলের লক্ষ্য বাজার ভরানো নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিশাল জ্বালানি ভাণ্ডারকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত করা।

ভেনেজুয়েলার সংকট কোনো মানবিক বা গণতান্ত্রিক নাটক নয়। এটি তেল, পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের আরেকটি নির্মম অধ্যায়—যেখানে একটি দেশের সার্বভৌম সম্পদ করপোরেট মুনাফার জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

আরও খবর

Sponsered content